যুদ্ধের ধরন বদলে দেবে চীন
অলংকরণ: এআই
যুদ্ধ মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো এবং নির্মম বাস্তবতাগুলোর একটি। একসময় যুদ্ধ হতো তলোয়ার, বর্শা কিংবা ধনুক-তির দিয়ে। পরে এসেছে কামান, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং পারমাণবিক অস্ত্র। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত একটি বিষয় অপরিবর্তিত ছিল—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিত মানুষই।
এখন সেই বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র এবং তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা কমে আসছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লক্ষ্য নির্ধারণ, আক্রমণ পরিচালনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণের মতো কাজ ক্রমশ যন্ত্রের হাতে চলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো আর মানুষ বনাম মানুষ হবে না; বরং হবে যন্ত্র বনাম যন্ত্রের লড়াই।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীনের নতুন প্রজন্মের বহুমাত্রিক ড্রোন-ঝাঁক বা ‘মাল্টিডোমেইন ড্রোন সোয়ার্ম’ প্রযুক্তি।
ড্রোন-ঝাঁক বলতে বোঝায় অসংখ্য ছোট ছোট চালকবিহীন উড়ন্ত যন্ত্র, যারা একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু চীনের পরিকল্পনা শুধু আকাশে উড়ন্ত ড্রোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশনের গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ, স্থল ও সমুদ্রে চলাচলকারী চালকবিহীন সব ধরনের যন্ত্রকে একটি অভিন্ন নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হবে।
চীনের ‘মাল্টিডোমেইন ড্রোন সোয়ার্ম’ বা বহুমুখী ড্রোন-ঝাঁক আগামীর যুদ্ধক্ষেত্রের এক ভয়ংকর অস্ত্র হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ আকাশে ড্রোন, সমুদ্রে চালকবিহীন নৌযান এবং স্থলে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় যান একে অপরের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করে একই যুদ্ধ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। এটি হবে এক ধরনের বিশাল যান্ত্রিক বাহিনী, যেখানে প্রতিটি সদস্য অন্যদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করবে।
চীনা গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বুদ্ধিনির্ভর যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে এই ছড়িয়ে থাকা যুদ্ধ-নেটওয়ার্ক। বড় আকারের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ড্রোন-ঝাঁক যোগাযোগে বিঘ্ন, তীব্র তড়িৎচৌম্বক বাধা কিংবা নিজেদের কিছু সদস্য ধ্বংস হয়ে গেলেও নতুন করে সংগঠিত হতে পারে। তারা নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নেয়, সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে এবং প্রয়োজন হলে মুহূর্তের মধ্যে নতুন নেতৃত্বও গড়ে তুলতে পারে।
এদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা। একটি ড্রোন হয়তো শুধু ছবি তুলছে, আরেকটি শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করছে, তৃতীয়টি যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করছে এবং চতুর্থটি আক্রমণ চালাচ্ছে। সব তথ্য একত্রিত হয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধচিত্র তৈরি করে।
এ কারণে সামরিক কৌশলেও বড় পরিবর্তন আসছে। আগে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের জন্য একটি নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করা হতো। প্রথমে শনাক্ত করা, তারপর তথ্য যাচাই, এরপর আক্রমণ। এখন চীন এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চায় যেখানে শত শত বা হাজার হাজার ড্রোন একযোগে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও আক্রমণ পরিচালনা করবে। ফলে পুরো যুদ্ধপ্রক্রিয়া একটি বিশাল জালের মতো কাজ করবে।
এই ব্যবস্থার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিস্থাপনযোগ্যতা। যদি কোনো ড্রোন ধ্বংস হয়ে যায়, অন্য ড্রোন সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। ফলে একটি বা কয়েকটি যন্ত্র হারালেও পুরো বাহিনী অচল হবে না। যুদ্ধক্ষেত্রে এটিই তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।
চীন এখন এমন ধারণা নিয়েও কাজ করছে যেখানে বড় জাহাজ, পরিবহন বিমান কিংবা স্থলভিত্তিক বিশাল যান হবে একেকটি ‘মাতৃযান’। সেখান থেকে মুহূর্তের মধ্যে শত শত বা হাজার হাজার ড্রোন মোতায়েন করা যাবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ড্রোন নজরদারি, আক্রমণ, বিভ্রান্তি সৃষ্টি কিংবা আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করবে।
চীনের সামরিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য কেবল কয়েকটি ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা নয়। বরং তারা প্রতিপক্ষের পুরো যুদ্ধব্যবস্থাকে অচল করে দিতে চায়। শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা, রসদ সরবরাহ কেন্দ্র, সামরিক সদর দপ্তর, উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদানের নেটওয়ার্ককে একযোগে আঘাত করার ধারণার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই কারণে ড্রোন-ঝাঁকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সাইবার আক্রমণ, তড়িৎচৌম্বক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং মহাকাশভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা। যুদ্ধের লক্ষ্য এখন শুধু শত্রুর সৈন্য হত্যা নয়; বরং তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই ধ্বংস করে দেওয়া।
তবে চীন শুধু আক্রমণাত্মক প্রযুক্তি নিয়েই কাজ করছে না। তারা ড্রোন-ঝাঁক প্রতিরোধের ব্যবস্থাও তৈরি করছে। লেজার অস্ত্র, উচ্চক্ষমতার মাইক্রোওয়েভ, তড়িৎচৌম্বক বাধা সৃষ্টি, ভুয়া নির্দেশনা পাঠানো এবং প্রতিরোধী ড্রোন ব্যবহারের মতো প্রযুক্তি নিয়ে তাদের গবেষণা চলছে।
কিন্তু এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যেও একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, চীনের বহু স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এখনও সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষ্যবস্তু আগে থেকে নির্ধারণ করতে হয়, দূর থেকে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় অথবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য মানবীয় অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
এর অর্থ হলো, যন্ত্র যত দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারছে, মানুষ তত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সময় সবচেয়ে দুর্বল অংশ হয়ে দাঁড়াতে পারে মানুষ নিজেই।
নতুন শক্তি, নতুন দুর্বলতা
অলংকরণ: এআই
প্রযুক্তি যেমন নতুন শক্তি দেয়, তেমনি নতুন দুর্বলতাও তৈরি করে।
ড্রোন-ঝাঁকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের নেটওয়ার্ক। আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও সেই নেটওয়ার্ক। যদি শত্রুপক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে, তথ্য বিকৃত করতে পারে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ তাই শুধু বন্দুক, ক্ষেপণাস্ত্র বা বারুদের লড়াই হবে না। এটি হবে তথ্যের লড়াই, যোগাযোগের লড়াই এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতির লড়াই।
একসময় যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সৈন্যসংখ্যা। পরে গুরুত্ব পেয়েছে ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান। আর আগামী দিনের যুদ্ধে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নেটওয়ার্ক।
চীনের বহুমাত্রিক ড্রোন-ঝাঁক প্রযুক্তি সেই নতুন যুগেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষ নয়, বরং যন্ত্রকে বসানোর এই প্রচেষ্টা হয়তো সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি এমন এক ভবিষ্যতেরও আভাস দেয়, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের নিয়ন্ত্রণ যত কমবে, অনিশ্চয়তা ততই বাড়বে। কারণ যেদিন যন্ত্র নিজেই যুদ্ধের গতি ও দিক নির্ধারণ করতে শুরু করবে, সেদিন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে?
সূত্র
১. চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (সিইটিসি)-এর গবেষণা ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন।
২. সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, বহুমাত্রিক ড্রোন-ঝাঁক প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিবেদন।
৩. মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর, চীনের সামরিক ও নিরাপত্তা উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৫।
৪. চায়না স্ট্র্যাটেজি ও এশীয় সামরিক বিশ্লেষণভিত্তিক গবেষণা।
৫. রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ড্রোন ও তড়িৎচৌম্বক যুদ্ধসংক্রান্ত উন্মুক্ত সামরিক মূল্যায়ন ও গবেষণা।
Comments
Post a Comment