মূল কনটেন্টে যান
ভিডিও মানে অন্যেরকল্পনা দেখা
পড়া মানে নিজেরকল্পনা গড়া
পড়ুন, কারণ টেক্সটভাবনার অবকাশ দেয়
সর্বশেষ

    মহাবিশ্বের নতুন চোখ: ডার্ক এনার্জির সন্ধানে রোমান টেলিস্কোপ

    আমরা যা কিছু দেখি, অনুভব করি—চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, ধূলিকণা আর উজ্জ্বল ছায়াপথ—এগুলো সব মিলিয়ে এই গোটা মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ। তাহলে বাকি ৯৫ শতাংশ কোথায়? বাকি পুরো মহাবিশ্বটাই ঢাকা পড়ে আছে এমন দুটি অদৃশ্য, অদ্ভুত এবং ভূতুরে জিনিসের চাদরে, যাদের কোনোদিন কোনো আলো দিয়ে সরাসরি দেখা যায়নি। এদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডার্ক ম্যাটার’ এবং ‘ডার্ক এনার্জি’ (অদৃশ্য শক্তি)।

    মহাবিশ্বের এই সবচেয়ে বড় রহস্যের জট খুলতেই মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা মহাকাশে পাঠিয়েছে তাদের সর্বাধুনিক সুপার-টেলিস্কোপ—ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। এর চোখ এতটাই চওড়া এবং শক্তিশালী যে, আমাদের পুরোনো বিখ্যাত হাবল টেলিস্কোপের চেয়ে এটি ১০০ গুণ শক্তিশালী, অর্থাৎ হাবলের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি আকাশ নিজের ফ্রেমে বন্দি করে ফেলতে পারে!

    কে এই ন্যান্সি রোমান? কেন তাঁর নামে এই শক্তিশালী দুরবিনের নামকরণ? কীভাবে কাজ করে এই অতিকায় মহাকাশ-ক্যামেরা, আর কীভাবেই বা এটি মহাবিশ্বের জন্ম-রহস্য আর ভিনগ্রহের সন্ধান এনে দেবে আমাদের।

    • হাবল টেলিস্কোপের চেয়ে ১০০ গুণ শক্তিশালী ও ওয়াইড-ফিল্ড ভিউ সম্পন্ন।
    • ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির রহস্য উদঘাটনে মহাকাশ জরিপের নতুন মানচিত্রকার।

    ন্যান্সি গ্রেস
    রোমান
    এই জাদুকরী টেলিস্কোপটির কথা জানতে হলে আগে জানতে হবে একজন অসাধারণ বিজ্ঞানীর কথা, যাঁর নাম ড. ন্যান্সি গ্রেস রোমান (১৯২৫–২০১৮)। মহাকাশ বিজ্ঞানের জগতে তাঁকে ভালোবেসে ডাকা হয় ‘মাদার অব হাবল’ বা হাবল টেলিস্কোপের জননী।আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে, ১৯২০-এর দশকে যখন ন্যান্সি রোমানের জন্ম হয়, তখন নারীদের বিজ্ঞান পড়া তো দূরের কথা, জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে স্বপ্ন দেখাও একরকম দুঃস্বপ্ন ছিল। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ন্যান্সি আকাশের প্রেমে পড়ে যান। মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি তাঁর বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব একটি ‘অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাব’ বা তারা দেখার দল! তিনি যখন বড় হয়ে কলেজে গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়তে চাইলেন, শিক্ষকেরা তাঁকে বলেছিলেন, ‘মেয়েদের এসব কঠিন অঙ্ক আর গ্রহ-নক্ষত্রের পেছনে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই।’

    কিন্তু ন্যান্সি কারও কথায় কান দেননি। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার পর, ১৯৫৯ সালে তিনি যোগ দেন সদ্য প্রতিষ্ঠিত মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায়। সেখানে তিনি ছিলেন নাসার ইতিহাসের প্রথম নারী নির্বাহী এবং নাসার প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

    শুধু মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ দেখত। কিন্তু ন্যান্সি প্রথম গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, পৃথিবীর চারপাশে বাতাস আর ধূলিকণার যে চাদর আছে, তা তারার আলোকে কাঁপিয়ে দেয় (ঠিক যেমন সুইমিং পুলের পানির তলায় থাকা কোনো কয়েন দেখলে কাঁপছে বলে মনে হয়)। তিনি বললেন, মহাবিশ্বকে যদি সত্যিই তার আসল রূপে দেখতে হয়, তবে টেলিস্কোপকে পৃথিবীর মাটির ওপর বসিয়ে রাখলে চলবে না, রকেটে করে পাঠিয়ে দিতে হবে মহাকাশের শূন্যতায়, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপরে।

    তাঁর এই অবিচল লড়াই আর পরিকল্পনার ফসলই ছিল বিখ্যাত হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। ন্যান্সি রোমানের আজীবন অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নাসা তাদের এই নতুন বিপ্লবী টেলিস্কোপটির নাম রেখেছে তাঁরই নামানুসারে—ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ (সংক্ষেপে ‘রোমান’)।

    মহাকাশের তিন পর্যবেক্ষক: হাবল, জেমস ওয়েব এবং রোমান

    রোমান স্পেস টেলিস্কোপ
    হাবল টেলিস্কোপ
    জেমস ওয়েব স্পেস
    টেলিস্কোপ



    আমাদের তো ইতোমধ্যেই ১৯৯০ সালে পাঠানো ‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ’ আছে, আবার ২০২১ সালে পাঠানো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’ও রয়েছে। তাহলে আবার নতুন করে এই ‘রোমান’ টেলিস্কোপের কী দরকার পড়ল?এই তিন টেলিস্কোপের কাজ কিন্তু এক নয়। একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে পার্থক্যটা বোঝা যাক:

    হাবল স্পেস টেলিস্কোপ: ধরুন, আপনি রাতের বেলা গভীর জঙ্গলে বাঘ খুঁজতে গেছেন। আপনার হাতে আছে একটি ভালো মানের সাধারণ দূরবীন। হাবল দিয়ে আপনি কোনো নির্দিষ্ট একটি তারামণ্ডলের ভেতরের দৃশ্য খুব স্পষ্ট দেখতে পাবেন, যেন দূরবীন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গাছের ডালে বসা পাখিকে নিখুঁতভাবে দেখছেন।

    জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ: জেমস ওয়েব হলো সেই জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া একটি শক্তিশালী ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বা অনুবীক্ষণ যন্ত্র! এটি কোনো নির্দিষ্ট একটি বস্তুর দিকে গভীর মনোযোগ দেয়। এটি সুদূর অতীতের ১৩০০ কোটি বছর আগের অতি প্রাচীন আদিম ছায়াপথগুলোর আণুবীক্ষণিক চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। অর্থাৎ এটি সুনির্দিষ্ট একটি বিন্দুকে জুম করে তার গভীরে ঢুকে যায়।

    রোমান স্পেস টেলিস্কোপ: রোমান কিন্তু জুম করার যন্ত্র নয়; রোমান হলো জঙ্গলের মাথার ওপরে ওড়ানো এক অতি-উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্যানোরামিক ড্রোন ক্যামেরা! এটি একবারে গোটা জঙ্গলটার ছবি আকাশ থেকে তুলে ফেলে।

    সহজ কথায়, হাবল বা জেমস ওয়েব যেখানে আকাশের একটি সরু বিন্দুর দিকে তাকিয়ে থাকে (যেমন খবরের কাগজের একটি অক্ষরের সমান জায়গা), রোমান সেখানে এক ক্লিকেই পুরো একটি খবরের কাগজের পাতার সমান আকাশ দেখে ফেলে।

    হাবল টেলিস্কোপে যেটুকু এলাকার ছবি তুলতে কয়েক মাস বা বছর লেগে যেত, রোমানের সাহায্যে ঠিক সেই সমপরিমাণ এলাকার হাই-রেজল্যুশন ছবি তুলতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন! আর এই কারণেই বিজ্ঞান মহলে রোমানকে বলা হচ্ছে মহাবিশ্ব জরিপ করার সবচেয়ে বড় মানচিত্রকার।

    একটি ক্যামেরা বা টেলিস্কোপ কতটা ভালো কাজ করবে, তা নির্ভর করে তার ভেতরে থাকা লেন্স এবং সেন্সরের ওপর। রোমান টেলিস্কোপের ভেতরে মূলত দুটি মূল বৈজ্ঞানিক চোখ বা যন্ত্র বসানো হয়েছে:

    ক. ওয়াইড ফিল্ড ইনস্ট্রুমেন্ট

    এটি হলো রোমানের প্রধান ক্যামেরা। আপনার স্মার্টফোনের ক্যামেরায় হয়তো ৫০ বা ১০৮ মেগাপিক্সেল থাকে। কিন্তু রোমানের এই ক্যামেরাটি তৈরি হয়েছে ৩০০.৮ মেগাপিক্সেলে। শক্তিসম্পন্ন ইনফ্রারেড সেন্সর দিয়ে এটি তৈরি। এর মধ্যে রয়েছে ১৮টি বিশেষ মারকারি-ক্যাডমিয়াম-টেলুরাইড ডিটেক্টর, যা মহাকাশের অদৃশ্য ইনফ্রারেড আলো শুষে নিতে পারে।

    সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, এর দেখার ক্ষেত্র বা ‘ফিল্ড অব ভিউ’। রোমানের মূল আয়নাটি হাবল টেলিস্কোপের মতোই ২.৪ মিটার চওড়া। কিন্তু এর ভেতরের অপটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, এটি হাবলের তুলনায় কমপক্ষে ১০০ গুণ বেশি আকাশ একবারে তার ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি করতে পারে।

    নাসার বিজ্ঞানীরা চমৎকার একটি তুলনা দিয়ে বুঝিয়েছেন: রাতের আকাশের বিখ্যাত ‘পিলার্স অব ক্রিয়েশন’ বা সৃষ্টিস্তম্ভের যে আইকনিক ছবি হাবল টেলিস্কোপ তুলেছিল, সেটি ছিল একটি ছোট্ট পোস্টকার্ডের মতো। আর রোমান টেলিস্কোপ সেই একই ছবির চারপাশের গোটা মহাজাগতিক দেয়ালটি এক ক্লিকেই আমাদের সামনে উন্মোচিত করে দেবে।

    খ. করোনাগ্রাফ ইনস্ট্রুমেন্ট

    এটি রোমানের দ্বিতীয় বৈজ্ঞানিক চোখ, যা এক অনন্য প্রযুক্তিগত বিপ্লব। এটি কীভাবে কাজ করে, তা আমরা একটু পরেই ভিনগ্রহের সন্ধানের অংশে বিশদভাবে জানব।

    ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি আসলে কী?

    আমরা সবাই জানি, মাধ্যাকর্ষণ বা গ্র্যাভিটি সবকিছুকে নিজের দিকে টানে। আপনি যদি একটা বল ওপরের দিকে ছুঁড়ে দেন, তবে গ্র্যাভিটির টানে বলটি আবার নিচে নেমে আসে। ঠিক তেমনি, মহাবিশ্বের সমস্ত গ্রহ, নক্ষত্র আর ছায়াপথের নিজস্ব ওজন বা ভর আছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মহাবিশ্বের সমস্ত ছায়াপথ গ্র্যাভিটির টানে একে অপরকে আকর্ষণ করবে এবং একসময় তাদের দূরে সরে যাওয়ার গতি কমে আসবে।

    কিন্তু ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী মহাকাশের বিস্ফোরিত নক্ষত্র (সুপারনোভা) পর্যবেক্ষণ করে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। তাঁরা দেখলেন, মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো পরস্পরের কাছাকাছি আসা তো দূরের কথা, উল্টো অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে একে অপরের কাছ থেকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে। আর দিন যত যাচ্ছে, তাদের এই পালিয়ে যাওয়ার গতি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

    বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এমনটা কীভাবে সম্ভব? আপনি ওপরের দিকে একটি পাথর ছুঁড়ে দিলেন, আর পাথরটি নিচে না এসে রকেটের মতো হু হু করে আরও দ্রুত ওপরে উঠে হারিয়ে যাচ্ছে—এটা কি কোনো সাধারণ নিয়মে হতে পারে? নিশ্চয়ই পেছনে অদৃশ্য কোনো চালিকাশক্তি আছে, যা মহাশূন্যের সবকিছুকে প্রবল জোরে বাইরের দিকে ঠেলে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

    এই অদৃশ্য, অজানা এবং মহাজাগতিক ধাক্কা প্রদানকারী শক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডার্ক এনার্জি’ বা অদৃশ্য শক্তি। এটি মহাবিশ্বের মোট ‍শক্তির প্রায় ৬৮ শতাংশ। আর বাকি ২৭ শতাংশ হলো ‘ডার্ক ম্যাটার’ বা অদৃশ্য বস্তু। এটি আবার ডার্ক এনার্জির উল্টো কাজ করে। এটি অনেকটা মহাজাগতিক আঠার মতো। ছায়াপথগুলো যখন চরকির মতো দ্রুত ঘোরে, তখন সাধারণ নিয়মে তাদের সব তারা চারদিকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য ভরের গ্র্যাভিটি সেই কোটি কোটি নক্ষত্রকে শক্ত করে এক জায়গায় ধরে রেখেছে। আলো এই ডার্ক ম্যাটারের ভেতর দিয়ে সরাসরি বেরিয়ে যায়, এটি আলো ছড়ায়ও না, শোষণও করে না; তাই একে কোনো টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা যায় না। বিজ্ঞানীরা শুধু এর মহাকর্ষীয় টান অনুভব করে বুঝতে পারেন যে ডার্ক ম্যাটার সেখানে উপস্থিত আছে।

    আমরা যে বিশ্বজগতে বাস করি, তার ৯৫ ভাগই এখনো মানুষের সম্পূর্ণ অজানা। আর এই ডার্ক এনার্জি ঠিক কী এবং সময়ের সাথে সাথে এর আচরণ কীভাবে বদলে যাচ্ছে—সেটি নিখুঁতভাবে মাপাই হলো রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মূল বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য।

    রোমান কীভাবে ডার্ক এনার্জির পরিমাপ করবে?

    যে জিনিস চোখে দেখা যায় না, আলোতে ধরা পড়ে না, তাকে রোমান টেলিস্কোপ কীভাবে মাপবে? বিজ্ঞানীদের কাছে এটি ছিল এক বিরাট বুদ্ধির খেলা। রোমান মূলত তিনটি চতুর বৈজ্ঞানিক কৌশলে ডার্ক এনার্জির রহস্য ভেদ করবে।

    ডার্ক এনার্জি পরিমাপের তিনটি চতুর হাতিয়ার

    │

    ├── ১. ব্যারিওন অ্যাকোস্টিক অসিলেশন: আদিম মহাজাগতিক শব্দতরঙ্গের মানচিত্র

    ├── ২. টাইপ ১ এ সুপারনোভা: মহাজাগতিক স্ট্যান্ডার্ড মোমবাতি

    └── ৩. দুর্বল মহাকর্ষীয় লেন্সিং: ডার্ক ম্যাটারের তৈরি আলোর বাঁক

    ১. ব্যারিওন অ্যাকোস্টিক অসিলেশন

    মহাবিশ্বের জন্মের ঠিক পরপরই, যখন চারদিক ফুটন্ত গরম ছিল, তখন কণার সমুদ্রের ভেতর দিয়ে শব্দের ঢেউ চলেছিল—ঠিক যেমন শান্ত পুকুরে ঢিল ছুঁড়লে পানির ওপরে গোল গোল ঢেউ তৈরি হয়। মহাবিশ্ব যখন ধীরে ধীরে ঠান্ডা হলো, সেই আদিম শব্দতরঙ্গগুলো মহাকাশের বুকে জমাট বেঁধে গেল এবং ছায়াপথগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বের বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়ল।

    রোমান মহাকাশের কোটি কোটি গ্যালাক্সির সুনির্দিষ্ট থ্রি-ডি মানচিত্র তৈরি করবে। এই মানচিত্রের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা আদিম সেই তরঙ্গের দূরত্ব মেপে বুঝতে পারবেন—সময়ের সাথে সাথে মহাশূন্য কতটা ফুলেফেঁপে বড় হয়েছে।

    ২. টাইপ ১এ সুপারনোভা

    মহাকাশে এক বিশেষ ধরনের শ্বেত বামন নক্ষত্র যখন ধ্বংস হয়ে যায়, তখন যে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে, তাকে বলে টাইপ ১এ সুপারনোভা। এই বিস্ফোরণগুলোর আলো সবসময় একই নির্দিষ্ট উজ্জ্বলতা ধারণ করে। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এদের বলেন ‘স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল’ বা আদর্শ মোমবাতি।

    রাতের অন্ধকারে দূরে কোনো মোমবাতি জ্বললে তা কতটা মৃদু দেখাচ্ছে, তা দেখে যেমন বলে দেওয়া যায় মোমবাতিটি কত দূরে আছে—ঠিক তেমনি সুপারনোভার আলো কতটা ম্লান হয়েছে তা দেখে বিজ্ঞানীরা বলে দেন ওই নক্ষত্রটি কত দূরে রয়েছে এবং ডার্ক এনার্জি তাকে কত দ্রুত দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। রোমান তার বিশাল চোখ দিয়ে কয়েক হাজার নতুন সুপারনোভা আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ করবে।

    ৩. দুর্বল মহাকর্ষীয় লেন্সিং

    আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলে, কোনো ভারী বস্তু মহাশূন্যের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দিতে পারে। ডার্ক ম্যাটারের বিশাল মেঘ যখন কোনো সুদূর ছায়াপথের সামনে থাকে, তখন পেছনের ছায়াপথ থেকে আসা আলো ডার্ক ম্যাটারের ভরের কারণে সামান্য বেঁকে যায় (যেমন ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বা চশমার লেন্স আলো বাঁকিয়ে দেয়)।

    রোমান টেলিস্কোপ আকাশে কোটি কোটি ছায়াপথের এই সূক্ষ্ম আলোর বিকৃতি পর্যবেক্ষণ করে একটি অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের মহাজাগতিক জাল উন্মোচন করবে। ফলে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন কোথায় কতটা ডার্ক ম্যাটার রয়েছে এবং ডার্ক এনার্জি কীভাবে তাদের ছড়িয়ে দিচ্ছে।

    ডার্ক এনার্জির পাশাপাশি রোমান টেলিস্কোপের দ্বিতীয় সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কাজ হলো সৌরজগতের বাইরের গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে বের করা। আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ভিনগ্রহ আবিষ্কার করেছেন। তবে এগুলোর বেশিরভাগই তাদের নিজস্ব সূর্যের খুব কাছাকাছি ঘোরে। কিন্তু রোমান এমন সব গ্রহ খুঁজবে, যেগুলো তাদের নক্ষত্র থেকে বেশ দূরে রয়েছে—ঠিক যেমন আমাদের পৃথিবী বা বৃহস্পতি সূর্য থেকে দূরে অবস্থান করে।

    রোমান এটি করবে ‘গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং’ এর সাহায্যে। ধরুন, অনেক দূরে একটি উজ্জ্বল তারা মিটমিট করছে। পৃথিবী আর সেই দূরবর্তী তারার ঠিক মাঝখান দিয়ে মহাকাশের অন্ধকারে ভেসে থাকা কোনো একটি অজানা গ্রহ পার হয়ে গেল। তখন সেই অজানা গ্রহটির নিজস্ব মহাকর্ষের কারণে পেছনের তারার আলো কয়েক ঘণ্টার জন্য হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। রোমান একটানা আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলের লাখ লাখ তারার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আলোকের এই সূক্ষ্ম ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে রোমান আবিষ্কার করবে হাজার হাজার নতুন গ্রহ।

    সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন মহাকাশে এমন কোটি কোটি গ্রহ রয়েছে, যাদের কোনো নিজস্ব সূর্য নেই! কোনো একসময় মহাজাগতিক সংঘর্ষ বা টানে তারা নিজেদের সৌরজগৎ থেকে ছিটকে বেরিয়ে মহাশূন্যের নিকষ অন্ধকারে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের বলা হয় ‘রগ প্ল্যানেট’ (Rogue Planet) বা যাযাবর গ্রহ। রোমান টেলিস্কোপ প্রথমবারের মতো এই যাযাবর গ্রহগুলোর সঠিক শুমারি করতে চলেছে।

    করোনাগ্রাফের ম্যাজিক

    ভিনগ্রহের ছবি সরাসরি ক্যামেরায় তোলা কেন এত কঠিন? একটা সহজ দৃশ্য কল্পনা করুন:

    মাঝরাতে একটি সুবিশাল বাতিঘরের তীব্র সার্চলাইট জ্বালানো আছে। আর সেই বাতিঘরের বাল্বটির ঠিক এক ইঞ্চি পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ছোট্ট একটি জোনাকি পোকা। আপনি যদি এক কিলোমিটার দূর থেকে বাতিঘরের দিকে তাকান, আপনি কি সেই জোনাকি পোকার মিটিমিটি আলো দেখতে পাবেন? কখনো না! বাতিঘরের তীব্র আলো আপনার চোখ ধাঁধিয়ে দেবে।

    মহাকাশে একটি উজ্জ্বল তারার পাশে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলোর অবস্থা ঠিক তেমনই। নক্ষত্রের আলো এতটাই তীব্র থাকে যে, গ্রহের আবছা আলো তার মধ্যে হারিয়ে যায়।

    এই অসম্ভবকে সম্ভব করতেই রোমান টেলিস্কোপে বসানো হয়েছে রোমান করোনাগ্রাফ ইনস্ট্রুমেন্ট (Coronagraph Instrument)। এটি এমন এক অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক চশমা, যা তারার তীব্র আলোকে এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগে (১:১,০০০,০০০,০০০) আটকে দিতে পারে! অর্থাৎ এটি তারার মূল আলোকে কৃত্রিমভাবে ঢেকে দিয়ে তার ঠিক পাশেই ঘুরে বেড়ানো শীতল গ্যাস দানব গ্রহ ও গ্রহ তৈরির ধূলিবলয়কে সরাসরি ক্যামেরায় ফুটিয়ে তুলবে।

    ভবিষ্যতে মহাকাশে এমন টেলিস্কোপ পাঠানো হবে, যা সরাসরি পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য গ্রহের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও পানির সন্ধান করবে। রোমানের এই করোনাগ্রাফ প্রযুক্তি সেই ভবিষ্যতের দরজাই উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।

    রোমান টেলিস্কোপ এখন কোথায়?

    রোমান স্পেস টেলিস্কোপ কিন্তু পৃথিবীর একদম কাছে ঘুরবে না। এটি অবস্থান করবে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে, সূর্য আর পৃথিবীর দ্বিতীয় ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্টে—যাকে বলা হয় ‘সান-আর্থ এল-২’ (Sun-Earth L2 Orbit)। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপও ঠিক এই জায়গাতেই অবস্থান করছে।

    এই জায়গাটি কেন এত স্পেশাল? মহাকাশের এই নির্দিষ্ট বিন্দুতে সূর্য এবং পৃথিবীর সম্মিলিত মহাকর্ষীয় টান এমন ভারসাম্য তৈরি করে যে, সেখানে থাকা কোনো কৃত্রিম উপগ্রহ খুব সামান্য জ্বালানি খরচ করেই সবসময় পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে সূর্যের চারদিকে ঘুরতে পারে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে কোনো দিন-রাতের ঝামেলা নেই, পৃথিবীর উত্তপ্ত বায়ুমণ্ডলের কোনো বাধা নেই। টেলিস্কোপটির পেছনে একটি বড় সানশিল্ড বা ছাতা মেলে দিয়ে সবসময় হিমশীতল ও স্থির পরিবেশে মহাবিশ্বের গভীরের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়।

    রোমান টেলিস্কোপের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক মিশনের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ বছর (যা পরবর্তীতে আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হতে পারে)। এই পাঁচ বছরে রোমান যে পরিমাণ বিশদ ডেটা ও ছবি পৃথিবীতে পাঠাবে, তা আগের যেকোনো মহাকাশ অভিযানের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।

    আর নাসার সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো—রোমানের সমস্ত ডেটা বিশ্বজুড়ে উন্মুক্ত থাকবে। অর্থাৎ নাসার গবেষকদের সাথে সাথে বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থী, তরুণ গবেষক বা সাধারণ বিজ্ঞানপ্রেমী ঘরে বসেই রোমানের পাঠানো আসল ডেটা বিশ্লেষণ করে নতুন নতুন নক্ষত্র বা গ্রহ আবিষ্কারের সুযোগ পাবে।

    মহাবিশ্ব কত বিশাল, তার তুলনায় আমরা কত ক্ষুদ্র—এই কথাটি ভেবে অনেকেই হয়তো একাকী বা অসহায় বোধ করতে পারেন। কিন্তু ড. ন্যান্সি গ্রেস রোমান বিশ্বাস করতেন ঠিক উল্টো কথা। তিনি ভাবতেন, এই সুবিশাল অসীম মহাবিশ্বের বুকে ধূলিকণার সমান একটি গ্রহে বাস করেও মানুষ তার কৌতূহল, মেধা আর ভালোবাসার শক্তিতে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের রহস্যকে জয় করতে পেরেছে—এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় মহিমা।

    রোমান টেলিস্কোপ যখন কোটি কোটি ছায়াপথের ছবি তুলে আমাদের কাছে পাঠাবে, তখন আমরা হয়তো জানতে পারব আমাদের মহাবিশ্ব কীভাবে একদিন শুরু হয়েছিল, আর কোটি কোটি বছর পরে এর পরিণতিই বা কী হবে। হয়তো কোনো এক সুদূরের ছায়াপথে খুঁজে পাওয়া যাবে নতুন কোনো পৃথিবীর ঠিকানা।

    সহায়ক তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

    NASA Science Mission Directorate: Nancy Grace Roman Space Telescope Overview

    About Roman & Instrument Details: Introducing the Roman Space Telescope

    NASA Jet Propulsion Laboratory (JPL): The Roman Coronagraph Instrument

    NASA Science Dark Energy Research: Dark Energy and Roman Mission

    NASA Science Exoplanets Exploration: Hunting Exoplanets and Rogue Planets with Roman

    Biography of Nancy Grace Roman: Who is Nancy Grace Roman? - NASA Science

    Space News & Astronomy Reports: ScienceDaily Space News ও Universe Today Space Exploration Updates

    সম্পর্কিত প্রতিবেদন

    Comments