আলো দিয়ে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ: স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত
একটি ছোট্ট সবুজ এককোষী শৈবাল জলাশয়ের পানিতে ভেসে বেড়ায় এবং আলোর দিকে সাঁতার কাটে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এটি প্রকৃতির একটি অতি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এই সাধারণ ঘটনাটির পেছনের বিজ্ঞান বোঝার চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে, যা মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার শত বছরের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কারণে ২০২৬ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল জয়ী হন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী কার্ল ডেইসারথ এবং জার্মানির দুজন বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল।
তাঁরা যৌথভাবে এমন একটি প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ বা নিউরনকে শুধুমাত্র আলোর সাহায্যে চালু বা বন্ধ করা যায়।
তারা যৌথভাবে এই প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, যারা মাধ্যমে জীবন্ত প্রাণীদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ বা নিউরনকে শুধুমাত্র আলোর সাহায্যে চালু বা বন্ধ করা যায়।
তাঁরা যৌথভাবে এমন একটি প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ বা নিউরনকে শুধুমাত্র আলোর সাহায্যে চালু বা বন্ধ করা যায়।
নোবেল কমিটির মতে, তাঁদের এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে প্রায় বৈদ্যুতিক সুইচের মতো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দিয়েছে। এর ফলে মানুষের স্মৃতি, ভয়, আনন্দ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আসক্তি এবং নানা জটিল স্নায়ুরোগ সম্পর্কে গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।
মানুষের মস্তিষ্ককে বলা হয় মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল কাঠামো। আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন বা ৮ হাজার ৬০০ কোটি স্নায়ুকোষ রয়েছে। এই কোষগুলো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন সংযোগ বা সিন্যাপসের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে অবিরাম বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেত বিনিময় করে চলেছে। আমরা যখন কথা বলি, কোনো পুরোনো মুখ চিনতে পারি, হঠাৎ ভয় পাই, কাউকে ভালোবাসি কিংবা জীবনের কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিই—এই সবকিছুর পেছনেই রয়েছে কোটি কোটি স্নায়ুকোষের অত্যন্ত জটিল ও সুশৃঙ্খল কার্যকলাপ।
কিন্তু বিজ্ঞানীদের সামনে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় এবং প্রায় অমীমাংসিত সমস্যা ছিল। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা জানার জন্য বিজ্ঞানীরা সাধারণত মস্তিষ্কের স্ক্যান বা ইলেকট্রোড (ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক তার) ব্যবহার করতেন। ধরা যাক, একজন মানুষ ভয় পেয়েছে বা একটি ইঁদুরকে কোনো ভীতিকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে। গবেষকরা স্ক্যান করে দেখতে পাচ্ছেন, ওই সময়ে মস্তিষ্কের কোন নির্দিষ্ট অংশ (যেমন অ্যামিগডালা) সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়—ওই স্নায়ুকোষগুলোর সক্রিয়তাই কি ভয় পাওয়ার মূল কারণ, নাকি ভয় পাওয়ার ফলে মস্তিষ্কের ওই অংশটি সক্রিয় হয়েছে? বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কো-রিলেশন (পারস্পরিক সম্পর্ক) এবং কজেশন (কার্যকারণ) এর পার্থক্য। শুধু মস্তিষ্কের স্ক্যান দেখে কার্যকারণ প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
একইভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট স্মৃতি, আবেগ বা আচরণের পেছনে ঠিক কোন স্নায়ুকোষগুলো কাজ করছে, তা নির্ভুলভাবে জানা কঠিন ছিল। ইলেকট্রোড ব্যবহার করে মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ প্রবাহ পাঠালে তা নির্দিষ্ট কোনো কোষকে আলাদাভাবে উদ্দীপিত করতে পারে না; বরং আশপাশের লাখ লাখ কোষকে একসঙ্গে উত্তেজিত করে তোলে। এটি অনেকটা এমন যে, আপনি একটি বিশাল স্টেডিয়ামে বসে থাকা নির্দিষ্ট একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন, কিন্তু আপনার হাতে থাকা মাইকের শব্দ পুরো স্টেডিয়ামের সবাই শুনতে পাচ্ছে। অন্যদিকে, রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করলে তা পুরো মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর প্রভাব শুরু বা শেষ হতে অনেক সময় লাগে।
বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি খুঁজছিলেন, যার সাহায্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষকে, নির্দিষ্ট মিলি-সেকেন্ড সময়ের জন্য, ইচ্ছামতো চালু বা বন্ধ করে দেখা যাবে—আসলে তারা কী কাজ করে। ১৯৯৯ সালে ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কারক এবং নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক প্রথম এমন একটি ধারণার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, স্নায়ুবিজ্ঞানের পরবর্তী বড় পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন আমরা আলোর মতো দ্রুতগামী কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। সেই সময় এটি কেবলই একটি কল্পনাবিলাস বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এই স্বপ্নকেই বাস্তব করেছে অপ্টোজেনেটিক্স।
একটি সবুজ শৈবাল থেকে জন্ম নেওয়া আবিষ্কার
এই যুগান্তকারী গবেষণার শুরুটা কোনো জটিল প্রাণীকে নিয়ে হয়নি। এর শুরু হয়েছিল জার্মানির একটি গবেষণাগারে, একটি সাধারণ এককোষী সবুজ শৈবাল নিয়ে। জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান দীর্ঘদিন ধরে ‘ক্ল্যামাইডোমোনাস রেইনহার্ডটিই’ নামের একটি ক্ষুদ্র শৈবাল নিয়ে কাজ করছিলেন।
এই এককোষী জীবটির বেঁচে থাকার জন্য সালোকসংশ্লেষণ প্রয়োজন, যার জন্য দরকার আলো। তাই এটি আলো বুঝতে পারে এবং সব সময় আলোর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু শৈবালটির কোনো চোখ নেই, স্নায়ুতন্ত্র নেই। তাহলে প্রশ্ন ছিল—এটি আলো দেখে কীভাবে? পিটার হেগেমান বুঝতে পেরেছিলেন, এই শৈবালের গায়ে নিশ্চয়ই এমন কোনো বিশেষ প্রোটিন আছে, যা সরাসরি আলোর প্রতি সংবেদনশীল। দীর্ঘ কয়েক দশকের নিরলস গবেষণার পর হেগেমান এবং তাঁর সহযোগী গেয়র্গ নাগেল এমন একটি বিশেষ প্রোটিন শনাক্ত করতে সক্ষম হন। তাঁরা এই প্রোটিনের নাম দেন ‘চ্যানেলরোডপসিন’।
কোষের আবরণ বা মেমব্রেনে থাকা এই প্রোটিনটি মূলত একটি ক্ষুদ্র দরজার মতো কাজ করে। সাধারণত এটি বন্ধ থাকে। কিন্তু যখনই এর ওপর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো (যেমন নীল আলো) পড়ে, প্রোটিনটির আকার পরিবর্তন হয় এবং দরজাটি খুলে যায়। এই খোলা দরজা দিয়ে কোষের বাইরের পরিবেশ থেকে পজিটিভ আয়ন (যেমন সোডিয়াম বা ক্যালসিয়াম আয়ন) কোষের ভেতরে প্রবেশ করে। আয়নের এই চলাচলের ফলে কোষের ভেতরে একটি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়। এই সংকেতটিই শৈবালটির লেজের মতো অংশ বা ফ্ল্যাজেলাকে নাড়িয়ে তাকে আলোর দিকে সাঁতার কাটতে নির্দেশ দেয়।
গেয়র্গ নাগেল পরীক্ষাগারে প্রমাণ করেন যে, এই চ্যানেলরোডপসিন প্রোটিনটি অন্য কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি নিজেই সরাসরি আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করতে পারে। অর্থাৎ, প্রকৃতি নিজেই লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে এমন একটি আণবিক ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছিল, যা আলোকে বিদ্যুতে পরিণত করার নিখুঁত কাজ করতে পারে।
২০০২ ও ২০০৩ সালে হেগেমান ও নাগেল যখন চ্যানেলরোডপসিনের আণবিক গঠন ও কার্যপ্রণালী নিয়ে তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, তখন তাঁরা দেখান যে, এই প্রোটিনটি স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোষেও সফলভাবে কাজ করতে পারে। এখানেই গবেষণার মোড় ঘুরে যায় এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের সঙ্গে এর সংযোগ ঘটে।
বিজ্ঞানীদের মনে একটি যুগান্তকারী প্রশ্ন উদয় হয়: যদি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এই শৈবালের প্রোটিনটি মানুষের বা অন্য কোনো প্রাণীর মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে বসিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কি বাইরে থেকে আলো ফেলে সেই স্নায়ুকোষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর খুঁজতে এগিয়ে আসেন মার্কিন বিজ্ঞানী কার্ল ডেইসারথ এবং তাঁর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল।
ডেইসারথ ছিলেন একজন মনোবিজ্ঞানী এবং স্নায়ুবিজ্ঞানী। তিনি মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতার মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে হতাশ ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মস্তিষ্কের ঠিক কোন সার্কিটগুলোর ত্রুটির কারণে মানসিক রোগ হয়, তা জানতে হলে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম হাতিয়ার দরকার। হেগেমান ও নাগেলের আবিষ্কার ডেইসারথের হাতে সেই কাঙ্ক্ষিত হাতিয়ার তুলে দেয়।
ডেইসারথ ও তাঁর সহকর্মীরা ল্যাবরেটরিতে একটি নিরীহ ভাইরাসের ভেতরে চ্যানেলরোডপসিনের জিনটি প্রবেশ করান। এরপর সেই ভাইরাসটিকে ইঁদুরের মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশে ইনজেকশন দেওয়া হয়। ভাইরাসটি মস্তিষ্কের কোষে গিয়ে শৈবালের সেই আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি করার নির্দেশ দেয়। এরপর গবেষকরা অপটিক্যাল ফাইবার বা সরু কাঁচের তারের মাধ্যমে ইঁদুরের মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট অংশে নীল আলো ফেলার ব্যবস্থা করেন।
২০০৫ সালে সম্পন্ন হওয়া এই পরীক্ষার ফলাফল ছিল আক্ষরিক অর্থেই অবিশ্বাস্য। আলো জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে ইঁদুরের স্নায়ুকোষটি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে শুরু করে। আলো বন্ধ করার কয়েক মিলি-সেকেন্ডের মধ্যেই কোষের কার্যকলাপ আবার বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ গবেষকরা প্রথমবারের মতো, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই, শুধুমাত্র আলো ব্যবহার করে জীবন্ত প্রাণীর স্নায়ুকোষকে ঠিক একটি বৈদ্যুতিক সুইচের মতো চালু ও বন্ধ করতে সক্ষম হন।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা প্রকৃতি থেকে আরও কিছু আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন আবিষ্কার করেন। যেমন, হ্যালোব্যাকটেরিয়া থেকে পাওয়া ‘হ্যালোদরডপসিন’ নামের প্রোটিন হলুদ আলো পড়লে কোষের ভেতরে নেগেটিভ ক্লোরাইড আয়ন প্রবেশ করায়, যা স্নায়ুকোষের কাজকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়। এর ফলে বিজ্ঞানীদের হাতে স্নায়ুকোষ চালু করার জন্য ‘অন সুইচ’ (নীল আলো) এবং বন্ধ করার জন্য ‘অফ সুইচ’ (হলুদ আলো)—উভয়ই চলে আসে।
স্মৃতি, আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের নতুন যুগ
অপ্টোজেনেটিক্স প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর মস্তিষ্ক গবেষণার ক্ষেত্রে যে নির্ভুলতা এসেছে, তা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি বড় বিপ্লব। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা গত দেড় দশকে এমন কিছু পরীক্ষা করেছেন, যা আগে কেবল কল্পবিজ্ঞান সিনেমাতেই সম্ভব বলে মনে হতো।
উদাহরণস্বরূপ স্মৃতির গবেষণার কথা বলা যায়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিলেন মস্তিষ্কে স্মৃতি ঠিক কোথায় এবং কীভাবে জমা থাকে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষকরা অপ্টোজেনেটিক্স ব্যবহার করে ইঁদুরের মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট ভীতিকর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি স্নায়ুকোষ শনাক্ত করেন। এরপর ইঁদুরটিকে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে রাখা হয়। যখনই অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে আলো ফেলে মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট কোষগুলোকে আবার সক্রিয় করা হয়, ইঁদুরটি হঠাৎ করেই ভয় পেয়ে গুটিসুটি মেরে যায়। অর্থাৎ, কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই শুধুমাত্র আলো দিয়ে তার মস্তিষ্কে একটি পুরোনো ভীতিকর স্মৃতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এমনকি আলো ব্যবহার করে ইঁদুরের মস্তিষ্কে এমন একটি ঘটনার ‘ভুয়া স্মৃতি’ তৈরি করাও সম্ভব হয়েছে, যা তার জীবনে কখনোই ঘটেনি।
মানুষের নানা আচরণের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি বুঝতেও সাহায্য করছে এই অপ্টোজেনেটিকস। মস্তিষ্কের যে অংশগুলো ভয়, উদ্বেগ, পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি বা আনন্দের সঙ্গে যুক্ত, বিজ্ঞানীরা এখন সেগুলোর নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করছেন। আসক্তির রহস্য উন্মোচনেও এটি বড় ভূমিকা রাখছে। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণকারী স্নায়ুপথ কীভাবে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে, তা অপ্টোজেনেটিকসের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ধাপে ধাপে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ল্যাবে ইঁদুরের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষ আলো দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে তার কোকেন আসক্তি সাময়িকভাবে দূর করার পরীক্ষা চালিয়েও বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন।
ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘুম, এমনকি আগ্রাসী আচরণের নিয়ন্ত্রক কোষগুলোও এখন বিজ্ঞানীদের পরিচিত। একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের নির্দিষ্ট কিছু কোষে আলো ফেললেই একটি শান্ত ইঁদুর হঠাৎ করে প্রচণ্ড আগ্রাসী হয়ে ওঠে এবং সামনে থাকা যেকোনো বস্তুকে আক্রমণ করতে শুরু করে। আলো বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে ইঁদুরটি আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। এসব পরীক্ষা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপই নির্দিষ্ট আচরণের সরাসরি কারণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা
অপ্টোজেনেটিকস বর্তমানে গবেষণাগারেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এটি এখনো সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতি হয়ে ওঠেনি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর সম্ভাবনা অপরিসীম। মানবদেহে সরাসরি আলো পৌঁছানোর অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে চোখের ক্ষেত্রে এই সমস্যা কম। চোখের ভেতরে এমনিতেই বাইরে থেকে আলো প্রবেশ করে।
রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা নামের একটি জন্মগত ও জিনগত রোগ রয়েছে, যার কারণে চোখের রেটিনার আলোক-সংবেদনশীল কোষগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় এবং মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এই রোগীদের রেটিনার পেছনের দিকের স্নায়ুকোষগুলো (গ্যাংলিয়ন সেল) সচল থাকে। গবেষকেরা জিন থেরাপির মাধ্যমে শৈবালের সেই চ্যানেলরোডপসিন প্রোটিনটি অন্ধ রোগীদের চোখের অবশিষ্ট স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়েছেন। এরপর বিশেষ ধরনের চশমার মাধ্যমে বাইরে থেকে আলো ফেলে ওই কোষগুলোকে উদ্দীপিত করা হয়েছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যাওয়া একজন রোগী এই চিকিৎসার পর জেব্রা ক্রসিংয়ের দাগ দেখতে পেয়েছেন এবং সামনের বস্তু শনাক্ত করতে পেরেছেন। অপ্টোজেনেটিকস ব্যবহার করে আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার এই সাফল্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বড় মাইলফলক।
এ ছাড়া পারকিনসন রোগ, মৃগীরোগ (এপিলেপসি) এবং স্ট্রোক-পরবর্তী স্নায়ু পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও অপ্টোজেনেটিকস নিয়ে নিবিড় গবেষণা চলছে। মৃগীরোগীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কিছু কোষ হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করতে শুরু করে, যার ফলে খিঁচুনি হয়। বিজ্ঞানীরা এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছেন, যা খিঁচুনির শুরুতেই তা শনাক্ত করবে এবং নির্দিষ্ট রঙের আলো ফেলে ওই অস্বাভাবিক স্নায়ুকোষগুলোকে শান্ত করে দেবে। পারকিনসন রোগীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে ইলেকট্রোড বসিয়ে যে ‘ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন’ দেওয়া হয়, তার বদলে অপ্টোজেনেটিকস ব্যবহার করা গেলে তা আরও অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট হবে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রায় থাকবে না বললেই চলে।
মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের ভয় কতটা ভিত্তিহীন
অপ্টোজেনেটিকস আবিষ্কারের পর থেকে একটি ভুল ধারণা সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই মনে করেন, বিজ্ঞানীরা এখন মানুষের মস্তিষ্ককে রিমোট কন্ট্রোলের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন এবং চাইলে যেকোনো মানুষের চিন্তাধারা পরিবর্তন করে দিতে পারবেন।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভয়টি সম্পূর্ণ অমূলক। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। অপ্টোজেনেটিকস প্রয়োগ করার জন্য প্রথমে মস্তিষ্কের কোষকে জেনেটিক্যালি মডিফাই বা জিনগতভাবে পরিবর্তন করতে হয়, যার জন্য মস্তিষ্কে ভাইরাস ইনজেকশন দেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আলো মানুষের মাথার খুলি ভেদ করে মস্তিষ্কের গভীরে যেতে পারে না। তাই মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্থানে আলো পৌঁছানোর জন্য সার্জারি করে মাথার খুলি ছিদ্র করে অপটিক্যাল ফাইবার বসাতে হয়। মানুষের মস্তিষ্কের মতো এত বিশাল এবং জটিল একটি অঙ্গে বিলিয়ন বিলিয়ন কোষের মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোষকে জিনগতভাবে পরিবর্তন করে সেখানে নিখুঁতভাবে আলো ফেলা অত্যন্ত দুরূহ কাজ।
বর্তমানে এই প্রযুক্তি গবেষণাগারে ইঁদুর বা বানরের মতো প্রাণীর ওপর, এবং অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সীমিত সংখ্যক মানুষের চোখের চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোনো সুস্থ মানুষের মাথার বাইরে থেকে আলো ফেলে তার চিন্তা, বিশ্বাস, স্মৃতি বা রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন করে ফেলার মতো প্রযুক্তি এখনো বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং এটি অদূর ভবিষ্যতেও বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অপ্টোজেনেটিকস মন নিয়ন্ত্রণের কোনো অস্ত্র নয়; এটি মূলত মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা বোঝার একটি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক লেন্স।
অপ্টোজেনেটিকস মন নিয়ন্ত্রণের কোনো অস্ত্র নয়; এটি মূলত মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা বোঝার একটি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক লেন্স।
অপ্টোজেনেটিকস মন নিয়ন্ত্রণের কোনো অস্ত্র নয়; এটি মূলত মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা বোঝার একটি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক লেন্স।
অপ্টোজেনেটিকস মন নিয়ন্ত্রণের কোনো অস্ত্র নয়; এটি মূলত মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা বোঝার একটি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক লেন্স।
প্রতি বছরই বিশ্বে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অনেক নতুন আবিষ্কার হয়। কিন্তু খুব কম আবিষ্কারই পুরো একটি বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রকে তার শেকড় থেকে বদলে দিতে পারে। কার্ল ডেইসারথ, পিটার হেগেমান এবং গেয়র্গ নাগেলের অপ্টোজেনেটিকস ঠিক তেমনই একটি বিরল এবং যুগান্তকারী আবিষ্কার।
পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল প্রকৃতির একটি ক্ষুদ্র এককোষী জীবের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিনের গঠন ও কার্যপ্রণালীর রহস্য উন্মোচন করেছিলেন। তাঁরা দেখিয়েছিলেন, প্রকৃতি কতটা নিখুঁতভাবে আলো ও বিদ্যুতের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। অন্যদিকে, কার্ল ডেইসারথ সেই আবিষ্কারের গুরুত্ব অনুধাবন করে তাকে মস্তিষ্ক গবেষণার এক অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী প্রযুক্তিতে পরিণত করেন। তাঁদের সম্মিলিত এই প্রচেষ্টার ফলেই বিজ্ঞানীরা আজ জীবন্ত মস্তিষ্কের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখতে পাচ্ছেন স্মৃতির জন্ম কোথায় হয় এবং আবেগের মৃত্যু কীভাবে ঘটে।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক বড় আবিষ্কারের শুরু হয়েছে ছোট এবং আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন একটি প্রশ্ন থেকে। একটি সাধারণ সবুজ শৈবাল কেন অন্ধকারের বদলে আলোর দিকে সাঁতার কাটে—এই সাধারণ কৌতূহল মেটাতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল কাঠামোটিকে পড়ার ভাষা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। মানব মস্তিষ্ক কীভাবে চেতনা তৈরি করে, স্মৃতি কীভাবে স্থায়ী হয়, বা ভয় ও আনন্দ কোথা থেকে আসে—এসব মৌলিক প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর বিজ্ঞান এখনো দিতে পারেনি। তবে অপ্টোজেনেটিকস মানবজাতির হাতে এমন একটি জাদুকরী আলোর সুইচ তুলে দিয়েছে, যার সাহায্যে মস্তিষ্কের অন্ধকার ও অজানা অঞ্চলগুলোকে আগামী দিনগুলোতে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হবে। নোবেল কমিটি মূলত প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র উপাদানকে কাজে লাগিয়ে মানুষের নিজেকে চেনার এই অসীম ক্ষমতাকেই সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়েছে।
সূত্র
১. নোবেল প্রাইজ প্রেস রিলিজ, দ্য নোবেল অ্যাসেম্বলি অ্যাট কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট, ৫ অক্টোবর ২০২৬ — nobelprize.org/prizes/medicine/2026/press-release/
২. নেচার, «Medicine Nobel awarded for brain switch that controls neurons with light», ৫ অক্টোবর ২০২৬ — nature.com/articles/d41586-026-03091-2
৩. অপ্টোজেনেটিকস: চ্যানেলরোডপসিন থেকে মস্তিষ্কের আলোক-নিয়ন্ত্রণ, এনআইএইচ/পিএমসি পর্যালোচনা — pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC3569634/
Comments
Post a Comment