বিটিভি টু টিকটক
আসানসোলের টোল থেকে পালিয়ে লেটোর দলে ভিড়ে দুখু মিয়া দুই হাতের মুঠোতে মন্দিরা নিয়ে যখন কীর্তন গানে সংগত করছিল, তখন সে ভাবতেও পারেনি, সে একদিন মুঠোফোন, মানে মোবাইলের স্বপ্নদ্রষ্টা হবে। মানুষ যে একদিন এই জিনিস আবিষ্কার করবে এবং তা মুঠোয় নিয়ে বিশ্বজগতের সব কিছু দেখবে, দুখু মিয়া তা বুঝতে পেরেছিল ‘কবি কাজী নজরুল ইসলাম’ হওয়ার পর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাবিলদারগিরি করা কবি নজরুল তাঁর ‘সংকল্প’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘বিশ্বজগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’
পরিতাপের কথা, কাজী সাহেব মোবাইলের ভবিষ্যদ্বাণী করলেও নির্দিষ্ট করে ফেসবুক জাতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপারে তেমন কিছু বলে যেতে পারেননি। তিনি যদি কষ্ট করে ‘লাইক’, ‘শেয়ার’, ‘কমেন্ট’ ও ‘সাবস্ক্রাইব’ নিয়ে কিছু পেশ করে যেতেন, ভালো হতো। তাহলে আমরা অন্তত তাঁর একটি কবিতা উদ্ধৃত করে এখনকার মতো প্রমাণ করতে পারতাম—রিলস্ জাতীয় কনটেন্ট আর টিকটক মার্কা জিনিসের উদ্ভাবন আসলে বাঙালির সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অবধারিত পরিণতি।
মুঠোর ভেতর বিশ্বজগৎ এখন ঢুকে গেছে ঠিকই, কিন্তু সমস্যা হলো, মুঠোটা ছোট, বিশ্বজগৎটা বড়। তার ওপর আবার ফেসবুকের হাত ধরে মুঠোফোনের স্ক্রিনে ঢুকে পড়ছে পাড়ার মফিজ ভাইয়ের সকালের নাশতা, পাশের বাসার ঝগড়া, কারও বিয়ের মঞ্চ, কারও বউ বা স্বামী তালাকের ঘোষণা, কারও কবরের পাশে লাইভ, কারও হাসপাতালে স্যালাইন নেওয়ার ভিডিও এবং অবশ্যই ‘বন্ধুরা, ভিডিওটা শেষ পর্যন্ত দেখবেন’—জাতীয় জরুরি রাষ্ট্রীয় বার্তা।
মানুষ আজকাল মুঠোফোনে পুরো পৃথিবী পকেটে-পকেটে, মুঠোয়-মুঠোয় বয়ে বেড়ায়। আবার সেই মানুষটাকেও বহন করছে পৃথিবী; মানে পৃথিবীরও ভেতরে থাকা ডেটা সেন্টারের বিশাল ডিজিটাল ভুঁড়ি। অর্থাৎ মানুষ ফোনে পৃথিবী ধরে রেখেছে, আর পৃথিবী মানুষকে ডেটার পেটে পুরে রেখেছে। আদতে কে যে কাকে বহন করছে—মানুষ মুঠোফোনকে, মুঠোফোন মানুষকে, নাকি দুজনকেই ধরে রেখেছে অ্যালগরিদম—এই দার্শনিক ধাঁধার মীমাংসা এখনো হয়নি। আদতে আপাতত অ্যালগরিদমই সব জেনে চুপচাপ বসে আছে; আমরা ভাবছি—আমরাই ফোন চালাচ্ছি।
আমাদের শৈশব ছিল বিটিভিসর্বস্ব। তখন বিশ্বদর্শন ছিল বাঁশের আগায়। আজকের মতো পৃথিবী তখন পকেটে ছিল না, পাড়ার পঞ্চাশটা চোখে ছিল। বিশ্বজগৎ দেখতে হলে ঘরের ছাদ ফুঁড়ে, লম্বা তল্লা বাঁশের মাথায় অ্যান্টেনা তুলে আকাশের সঙ্গে একরকম কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হতো।
মনে পড়ে, বাড়ির আশপাশে বিশাল লম্বা তল্লা বাঁশ শূন্যের দিকে তুলে দেওয়া থাকত। বাঁশের আগায় বাঁধা থাকত অ্যান্টেনা। সেই অ্যান্টেনা এমন এক বস্তু, যার সঙ্গে টেলিভিশনের সম্পর্ক ছিল, আবার বাড়ির কর্তার ধৈর্য, পাড়ার মানুষের সামাজিকতা, শিশুর চিৎকার এবং আবহাওয়ার মেজাজেরও সম্পর্ক ছিল। অ্যান্টেনা একটু এদিকে হলে আফগানিস্তান, একটু ওদিকে হলে অন্ধকার; আর ঠিক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালে বিটিভি।
একজন বাইরে দাঁড়িয়ে বাঁশটা ধরে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে চেঁচিয়ে বলত—
—কী রে, আইছে? আইছে?
ঘরের ভেতর থেকে জবাব আসত—
—না, আসে নাই। এহনও ঝিরঝির।
বাইরের লোক আবার বাঁশ মোচড়াত। বাঁশের সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার মানুষের বুকও মোচড়াত। একটু ডানে, একটু বাঁয়ে, সামান্য সামনের দিকে, তারপর এক চুল পেছনে। বাঁশের দোলায় ঘরের ভেতরে পর্দার ওপর শুরু হতো সাদা-কালো ভূমিকম্প। দাগ, দোলা, ধোঁয়া আর ধাঁধার মধ্যে নায়ক-নায়িকার মুখ মাঝে মাঝে ভেসে উঠত। মানুষ হা করে তাকিয়ে থাকত। টিভি তখন কেবল বাক্স ছিল না, ছিল বাঁশ, বায়ু, ভাগ্য ও বিদ্যুতের সম্মিলিত পরীক্ষা।
তারপর আচমকা ভেতর থেকে চিৎকার—
—আইছে! আইছে! কিলিয়ার আইছে! আর নাড়াইস না!
এই মুহূর্তে বাঁশের মানুষটির ওপর যে দায়িত্ব এসে পড়ত, তা আজকের দিনের একজন সার্জন, স্যাটেলাইট বিজ্ঞানী কিংবা প্রধান নির্বাচন কমিশনারও হয়তো কল্পনা করতে পারবেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জমে যেতেন। যেন অপারেশন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে সার্জনের নির্দেশ পেয়েছেন—ছুরি আর এক মিলিমিটারও নড়ানো যাবে না।
একটু নড়লেই ‘কিলিয়ার’ থেকে ‘ঝিরঝির’; আনন্দ থেকে আতঙ্ক, বিনোদন থেকে বিপর্যয়, সভ্যতা থেকে বর্বরতা।
ঘরের ভেতর টিভির সাদাকালো পর্দার দিকে সব চোখ হুমড়ি খেয়ে পড়ত। আশপাশের পনেরো-বিশটি বাড়ি থেকে আসা দর্শক গাদাগাদি করে বসত। কেউ খাটে, কেউ মেঝেতে, কেউ জানালার ফাঁকে, কেউ দরজার চৌকাঠে। কারও হাঁটুর ওপর কারও হাত, কারও কাঁধে কারও কনুই, কারও মাথার ওপর আরেকজনের মুখ। পেছনের দর্শকদের সবচেয়ে বেশি শোনা যেত—
—একটু সরেন তো!
—মাথাডা নামান!
—আমাগো এইহান থাইক্যা তো কিছুই দেখা যায় না!
তবু কেউ উঠত না। সিনেমা দেখার চেয়ে সিনেমা দেখতে পারাটাই ছিল বড় ঘটনা। আজকের ভাষায় এটিকে বলা যায় ‘কমিউনিটি স্ক্রিনিং’। তখন ‘কমিউনিটি’ শব্দটি ছিল না, কিন্তু সত্যিকারের কমিউনিটি ছিল।
আজকের প্রজন্মকে এই দৃশ্য বোঝানো কঠিন। কারণ এখন একজন মানুষ একই ঘরে বসে একই সময়ে তিনটি স্ক্রিনে তিন ধরনের বিনোদন নিতে পারে। এক চোখে সিরিজ, আরেক চোখে রিল, কানে ইয়ারফোনে গান। আর মাঝখানে অবশ্য মন্তব্যের ঘরে কারও সঙ্গে রাজনৈতিক তর্ক। এখনকার মানুষ কনটেন্ট দেখতে দেখতে কনটেন্ট বানায়, কনটেন্ট বানাতে বানাতে অন্যের কনটেন্টের সমালোচনা করে এবং সমালোচনা করতে করতে স্ক্রল করে আরেকটি কনটেন্টে চলে যায়।
আমাদের সময় একটিমাত্র পর্দা দেখতে এত মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ত; এখন একটি মানুষকে দেখার জন্য শত শত পর্দা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।
আশির দশকের পুরোটা এবং নব্বইয়ের শেষ নাগাদ মফস্বল শহরগুলোতে ওই দৃশ্য ছিল নিত্যকার। বিটিভিতে মাসের মধ্যে যে একদিন ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’, ‘কাচের দেয়াল’, ‘সুতরাং’ কিংবা এই ধরনের কোনো চলচ্চিত্র চলত, সেদিন দর্শকদের বসতে দেওয়ার জায়গা ঘরে হতো না। টিভি চলে আসত বারান্দায়। দর্শক ছড়িয়ে পড়ত উঠোনে। হোগলার চাটাই কিংবা খেজুরের পাটিপাতায় বসে সিনেমা দেখা হতো।
সিনেমা শুরু হওয়ার অনেক আগেই শুরু হতো ‘সিনেমা দেখার অনুষ্ঠান’। কে আগে এসে সামনের জায়গা দখল করবে, কে খাটে বসবে, কে মেঝেতে, কে দরজার কাছে দাঁড়িয়েও পর্দার অর্ধেক দেখতে পারবে—এ নিয়ে নীরব কিন্তু নিরন্তর প্রতিযোগিতা চলত।
সিনেমা ছিল, দর্শক ছিল, বিস্কুট ছিল, বিড়ি ছিল—বিদ্যুৎ থাকলে সবকিছুই ছিল। বিদ্যুৎ না থাকলে ছিল শুধু সম্মিলিত হতাশা।
কারেন্ট যাওয়ার পর টিভির পর্দা অন্ধকার হতেই ঘরের ভেতর থেকে একসঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠত। কেউ জানালার দিকে তাকাত, যেন বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারী পাশের গাছে বসে আছেন। কেউ সুইচ টিপত। কেউ আবার অন্ধকারেই আশাবাদী হয়ে বলত—
—আসবে, আসবে, এই তো আসবে।
বিটিভির যুগ আমাদের শুধু নাটক-সিনেমা দেখায়নি; অপেক্ষা করতে শিখিয়েছে। তখন বিনোদন ছিল দুর্লভ, তাই তার জন্য ধৈর্য ছিল। এখন বিনোদন দুর্লভ নয়, ধৈর্যই দুর্লভ। তখন ছবি আসার অপেক্ষায় মানুষ বসে থাকত; এখন মানুষ ছবি আসার আগেই স্ক্রল করে চলে যায়।
সময় বদলেছে। বাঁশ গেছে, অ্যান্টেনা গেছে, সাদাকালো গেছে, বিটিভির একচ্ছত্র বাদশাহিও গেছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয়, পৃথিবী যখন এত সহজে আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, তখন সেই বাঁশের আগার দূরের পৃথিবীটাই হয়তো বেশি রোমাঞ্চকর ছিল।
কারণ তখন ‘বিশ্বদর্শন’ পেতে সবাইকে একসঙ্গে আকাশের দিকে তাকাতে হতো। আর এখন সবাই নিজের নিজের মুঠোর দিকে তাকিয়ে আছে।
তখন একটাই টিভি। বিটিভি। টেলিভিশন মানেই বিটিভি, বিটিভি মানেই টেলিভিশন। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনোদনের ওপর তার ছিল একচ্ছত্র, একক, একমাত্র অধিকার। গণতন্ত্রের মতোই বিনোদনও ছিল সীমিত—তবে দুটির মধ্যে পার্থক্য ছিল, গণতন্ত্রে বিকল্প না থাকলে মানুষ প্রশ্ন করত, বিনোদনে বিকল্প না থাকলে বলত, ‘বাহ, কী দারুণ নাটক!’
তবে এই সীমাবদ্ধতার একটা বড় সুবিধা ছিল। সবাই অন্তত একই জিনিস নিয়ে আলোচনা করত। জাতীয় ঐক্য তখন নাটকের নায়ক-নায়িকার কাঁধে দাঁড়িয়ে ছিল।
নাটক শেষ হলে পরদিন স্কুলে, অফিসে, বাজারে, বাসস্ট্যান্ডে, চায়ের দোকানে—সর্বত্র একই আলোচনা।
—গতকালের নাটকটা দেখছেন?
—হ, দেখছি।
—শেষের দৃশ্যটা বুঝছেন?
প্রশ্নটা শুনে কেউ একটু থমকে যেত। চোখে এক ধরনের চিন্তাশীলতা এনে বলত—
—হ, হ, বুঝছি।
আসলে সে কিছুই বোঝেনি। কিন্তু না বুঝে থাকাটাও তখন ব্যক্তিগত ব্যাপার ছিল না। কারণ পুরো জাতিই একসঙ্গে একই নাটক দেখেছে, একই জায়গায় বিভ্রান্ত হয়েছে এবং পরদিন একে অপরের সামনে জ্ঞানীর ভাব করেছে।
তখন সাংস্কৃতিক অজ্ঞতাও ছিল সম্মিলিত। এখন অজ্ঞতা ব্যক্তিগত, পছন্দ ব্যক্তিগত, পর্দা ব্যক্তিগত, প্লে–লিস্ট ব্যক্তিগত—কিন্তু আত্মবিশ্বাস সর্বজনীন। এখন একজন মানুষ তিন মিনিটের ইউটিউব ভিডিও দেখে পৃথিবীর ইতিহাস, পাঁচ মিনিটের রিল দেখে অর্থনীতি এবং সাত মিনিটের পডকাস্ট দেখে ভূরাজনীতি বুঝে ফেলেন। এরপর কমেন্ট বক্সে গিয়ে বিশেষজ্ঞদেরও শিক্ষা দেন।
তখন অজ্ঞ লোক বলত, ‘আমি বুঝি নাই।’
এখন অজ্ঞ লোক বলে, ‘আপনারা কেউ বুঝেন নাই।’
বিটিভিতে সাপ্তাহিক নাটক চলত। দ্বিতীয় কোনো চ্যানেল ছিল না বলে তুলনা করার সুযোগও ছিল না। তুলনা না থাকলে জিনিস খারাপ কি ভালো, সে প্রশ্নও অনেক সময় ওঠে না। ঘরে যদি একটাই আয়না থাকে, মুখ যেমনই হোক, সেটাকেই চেহারা বলে মেনে নিতে হয়।
সেখানে যা চলত, সেটাই আমাদের চোখে দুর্দান্ত জিনিস মনে হতো। নাটক ভালো কি না, তার চূড়ান্ত বিচারক ছিল নাটক নিজেই। কারণ তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। রিমোট ছিল না, বিকল্প ছিল না, বিতর্ক ছিল না। ছিল বসে থাকা।
এখন পেছনে তাকিয়ে কেউ কেউ হয়তো বলবেন, একচ্ছত্রতার কারণেই বিটিভি আমাদের রুচিকে নিয়ন্ত্রণ করত। কথাটা সত্য। তবে রুচি নিয়ন্ত্রণেরও একটা সুবিধা আছে—অন্তত সবাই জানে, কোন জিনিসটি ‘ভালো’ বলে মানতে হবে। নিজের পছন্দের স্বাধীনতা না থাকলে ভুল পছন্দ করার ভয়ও থাকে না।
আমরা এক ধরনের গৎবাঁধা সাংস্কৃতিক রুচির হাত ধরে চলছিলাম। যেন রুচিরও একজন অভিভাবক ছিলেন। তিনি বলতেন—
—এই নাটকটি ভালো।
আমরা বলতাম—
—জ্বি।
তিনি বলতেন—
—এই গানটি শুদ্ধ।
আমরা বলতাম—
—জ্বি।
তিনি বলতেন—
—এই ভাষাতেই কথা বলতে হবে।
আমরা বলতাম—
—জ্বি।
তিনি যদি বলতেন, ‘আজ থেকে সবাই রাত আটটায় ছাগলের জীবন নিয়ে নির্মিত পরীক্ষামূলক নাটক দেখবেন’, আমরা হয়তো সামনের দিন চায়ের দোকানে বসে বলতাম—
—কালকের নাটকটা কিন্তু দারুণ হইছে।
—হ, হ। বিশেষ করে ছাগলটার অভিনয়!
এক চ্যানেলের যুগে রুচি ছিল রেশনিংয়ের মতো—যা দেওয়া হতো, তাই ভাগ করে, ভেবে, ভদ্রভাবে খেতে হতো। পছন্দ করার অধিকার ছিল কম, কিন্তু পছন্দ নিয়ে ঝামেলাও কম। সবার সাংস্কৃতিক খাদ্যতালিকা মোটামুটি এক। কেউ নাটক খাচ্ছে, কেউ গান খাচ্ছে, কেউ খবর খাচ্ছে—কিন্তু রান্নাঘর একই।
তারপর প্রায় চার দশক কেটে গেল। কালে কালে কত কী দেখলাম। একটার জায়গায় পনেরো-বিশটা চ্যানেল হলো। তারপর পঞ্চাশটা, একশটা, তারও বেশি। সাংস্কৃতিক একচ্ছত্রতা ভেঙে শুরু হলো বিনোদনের বহুদলীয় গণতন্ত্র।
প্রথমে মানুষ মহাখুশি। এই চ্যানেলে নাটক, ওই চ্যানেলে সিনেমা, আরেক চ্যানেলে গান, অন্য চ্যানেলে খবর। তারপর আরও নাটক, আরও সিনেমা, আরও গান। শেষ পর্যন্ত এত বিকল্প এলো যে মানুষ রিমোট হাতে বসে প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে লাগল—কী দেখবে।
তারপর ক্লান্ত হয়ে মোবাইল দেখতে শুরু করল।
সেখানে হাজার পদের নাটক হতে থাকল। প্রেমের নাটক, প্রতিশোধের নাটক, পরিবার ভাঙার নাটক, পরিবার জোড়ার নাটক, শাশুড়ির নাটক, পুত্রবধূর নাটক, ভূতের নাটক, গোয়েন্দার নাটক। এমনকি কোনো কোনো নাটক দেখে মনে হতো, নাটকের সবচেয়ে বড় নাটক হলো—এটা কীভাবে নাটক হলো!
বিটিভির যুগে প্রথমে মাসে একটা, তারপর সপ্তাহে একটা করে সিনেমা হতো। স্যাটেলাইট চ্যানেল এসে সিনেমার বাঁধ ভেঙে বন্যা বইয়ে দিল। প্রতিদিন বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি—আরও কত ভাষার সিনেমা!
একসময় সিনেমা ছিল অনুষ্ঠান। এখন সিনেমা হলো উপকরণ।
একসময় সিনেমা দেখার জন্য সময় বের করতে হতো। এখন সময় কাটানোর জন্য সিনেমা চালাতে হয়।
একসময় মানুষ সিনেমার সংলাপ মুখস্থ করত। এখন পাঁচ সেকেন্ডের একটি দৃশ্য কাট করে ‘মিম’ বানায়। আগে সিনেমা নিয়ে আলোচনা চলত কয়েক দিন। এখন একটা সিরিজ মুক্তি পায়, দুই দিন ধরে আলোচনা হয়, তৃতীয় দিনে মানুষ নতুন কনটেন্টের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে।
বিটিভির যুগে কনটেন্ট ছিল কম, কৌতূহল ছিল বেশি। এখন কনটেন্টের কুল-কিনারা নেই, কিন্তু কৌতূহল পাঁচ সেকেন্ডের।
সেই যে এক চ্যানেলের তালাবদ্ধ, তবু তালমিলানো রুচি থেকে বেরিয়ে আমরা বহুচ্যানেলের বিশাল বিনোদনবাজারে ঢুকলাম, তখন কেউ ভাবেনি—একদিন এমন সময়ও আসবে, যখন এতকিছুর মধ্যেও মানুষ আবার বলবে—
—দেখার মতো কিছু নাই।
এটাই বোধ হয় প্রাচুর্যের সবচেয়ে বড় পরিহাস।
ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে খাবার নেই—এটা দুর্ভিক্ষ। আর পেটভরা মানুষের সামনে হাজার পদের খাবার সাজানো, অথচ সে বলছে ‘খাইতে ভালো লাগে না’। এটা আধুনিক সভ্যতার বদহজম।
মানুষের জীবনে প্রাচুর্য সব সময় আনন্দ আনে না। কখনো কখনো প্রাচুর্য মানুষকে পেটের দিক থেকে নয়, মাথার দিক থেকে বদহজম করায়।
প্রতিদিন সকালে একটা আটার রুটির সঙ্গে একটা ডিম আর রাতে এক পদের তরকারি দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে যে লোক অভ্যস্ত, তার সামনে প্রতিদিন তিন বেলা মাছ-মাংস-ফলফলাদির দশ-বারো পদের খাবার দিলে যে অবস্থা হয়, বিটিভি পার হওয়া স্যাটেলাইট চ্যানেল যুগের দর্শকদেরও তাই হলো।
প্রথম দিন সে খুশি। দ্বিতীয় দিন উৎসাহী। তৃতীয় দিন অভ্যস্ত। সপ্তম দিন বিরক্ত। তারপর একদিন সে বলে, ‘খাওয়ার মতো কিছু নাই?’
সমস্যা খাবারের অভাব নয়। সমস্যার নাম অতিভোজন।
আমাদের রুচির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এত বেশি দেখতে দেখতে আমরা দেখার ক্ষমতাই হারাতে শুরু করেছি। এত বেশি শুনতে শুনতে শোনার ধৈর্য হারিয়েছি। এত বেশি বলতে বলতে ভাবার অভ্যাস গেছে। এখন আমাদের কাছে কোনো কনটেন্ট তিন মিনিটের বেশি হলে ‘ডিটেইলস’, পাঁচ মিনিট হলে ‘লম্বা’, দশ মিনিট হলে ‘ডকুমেন্টারি’, আর আধা ঘণ্টা হলে ‘ভাই, শর্ট করে বলেন’।
সভ্যতার অন্যতম ট্র্যাজেডি হলো, জ্ঞানের পরিমাণ বাড়ে; কিন্তু মানুষের মনোযোগের মেয়াদ কমে।
বিটিভির প্রায় সব নাটকে মধ্যবিত্ত চরিত্রগুলো টাইপ করা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলত। কথার মধ্যে এক ধরনের পরিচ্ছন্নতা ছিল। কখনো কখনো এতটাই পরিচ্ছন্ন যে মনে হতো, মানুষগুলো বাজারে যান না, বাসে ওঠেন না, বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়ার ঝগড়া করেন না। কিন্তু বারোয়ারি চ্যানেলের যুগে সেই চরিত্রগুলো ‘যাইতাছি, খাইতাছি’ বলা শুরু করল।
এতে কেউ কেউ আতঙ্কিত হলেন। বাংলা ভাষা বুঝি গেল! ভাষা অবশ্য যায়নি। ভাষা কোনো সরকারি দপ্তর নয় যে ফাইল আটকে গেলে বন্ধ হয়ে যাবে। ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের মুখে। তবে বাজার যখন ভাষাকে পণ্য বানায়, তখন ভাষাও নিজের জামা বদলায়।
এরপর সন্ধ্যার পর মূলত মা-খালাদের—বাবা-খালুরাসহ—টিভি সিরিয়ালে আসক্তি বাড়ল। রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে এ চ্যানেল থেকে সে চ্যানেলে যাওয়া-আসা শুরু হলো। এদিকে এক সিরিয়ালে শাশুড়ি পুত্রবধূকে বিষ খাওয়াচ্ছেন, ওদিকে আরেক সিরিয়ালে বিশ বছর আগে মারা যাওয়া নায়ক প্লাস্টিক সার্জারি করে ফিরে এসেছেন। মানুষের বাস্তব জীবনে এত নাটক নেই। তাই নাটকে বাস্তবতা থাকাও জরুরি নয়।
রিমোটের এই ক্ষমতাটি অবশ্য রাজনৈতিক শিক্ষাও দিয়েছে। আপনি পছন্দ না করলে চ্যানেল বদলাবেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষ, সরকার, সমাজ, বাজার, যানজট—কোনোটারই রিমোট আপনার হাতে নেই। ফলে আমরা ক্রমে এমন এক মানসিকতার মানুষ হলাম, যারা সবকিছুকে রিমোটের বোতাম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। না পারলে কমেন্ট বক্সে গালি দেয়।
বিদ্রোহী কবির ভবিষ্যদ্বাণী সত্য করে দিয়ে ইন্টারনেটের হাত ধরে লোকের হাতের মুঠোয় ‘বিশ্বজগৎ’ চলে এল। নেটফ্লিক্স থেকে ফেসবুক। ইউটিউব থেকে ইনস্টাগ্রাম। টিকটক থেকে রিল।
এখন আর ঘটনার পর ঘণ্টা ধরে সিরিয়াল দেখায় সুখ নেই। এখন মানুষ ফলাফল চায়, ভূমিকা নয়; ঘটনা চায়, প্রেক্ষাপট নয়; উত্তেজনা চায়, ব্যাখ্যা নয়। এখন মানুষের ধৈর্য এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কেউ যদি ‘একটা কথা বলি’ বলে দুই মিনিট সময় নেয়, আমরা সন্দেহ করি—লোকটি নিশ্চয়ই আমাদের সময় চুরি করছে।
এখন হাওর-বাঁওড়ের দেশি কই মাছ পেলে লোকে যেমন ওষুধ-বিষুধ খাইয়ে খামারে চাষ করা থাই কই খায় না, তেমনি ফেসবুকে প্রতিদিনকার জীবনের কাঁচা বা ‘র’ দৃশ্য পেয়ে লোকের আর ‘লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের’ কনটেন্ট আগের মতো ভালো লাগে না।
বাস্তবতা এখন বিনোদনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। কারণ এখানে কোনো সেট সাজাতে হয় না। প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া লাগল—লাইভ। রাস্তার পাশে দুর্ঘটনা—লাইভ। স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য—লাইভ। সন্তান কথা শুনছে না—লাইভ। কেউ অসুস্থ—লাইভ। কেউ মারা গেলেও অনেক সময় শোকের আগে লাইভ।
মানুষ এখন আর শুধু জীবন যাপন করে না; জীবন ধারণও করে।
একসময় বিখ্যাত হওয়ার জন্য প্রতিভা দরকার ছিল। পরে সুযোগ দরকার হলো। এখন ক্যামেরা সামনে রাখা দরকার। আর কিছু না থাকলেও চলবে।
এখানে সাধারণ মানুষই খবর, সাধারণ মানুষই বিনোদন। যিনি মতামত দিচ্ছেন, শুনছেনও তিনিই। ‘আমরা সবাই রাজা’ টাইপের এই পরিসর চব্বিশ ঘণ্টার চ্যানেলের মতোই সাধারণ মানুষের আত্ম-অভিব্যক্তির এক বর্ণিল বিচিত্রানুষ্ঠান।
তবে ‘আমরা সবাই রাজা’ কথাটার সঙ্গে ছোট্ট একটি বাস্তবতা জুড়ে দেওয়া দরকার—রাজা অনেক, কিন্তু রাজদণ্ডটি অ্যালগরিদমের হাতে।
আপনি কী দেখবেন, তা আপনি ঠিক করেন—এটা বিশ্বাস করার জন্যই ফেসবুক-টিকটক আপনাকে স্বাধীনতা দিয়েছে। বাস্তবে আপনি যা দেখছেন, তার অনেকটাই ঠিক করে দিয়েছে এমন এক অদৃশ্য ব্যবস্থা, যার কাছে আপনার রুচি, রাগ, দুর্বলতা, ভয়, প্রেম, লজ্জা—সবই পরিমাপযোগ্য তথ্য।
মানুষ নিজেকে স্বাধীন ভাবে। অ্যালগরিদম তাকে দেখে হাসে।
বাদাম বেচতে গিয়ে মুখে মুখে বানানো গানও এখানে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। একটি লোকের একটি অট্টহাসির ভিডিও তাঁকে রাতারাতি সেলিব্রেটি বানিয়ে দিতে পারে। কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নাচলেন, কেউ আজব উচ্চারণে কথা বললেন, কেউ ক্যামেরা দেখে চিৎকার করলেন—দেখতে দেখতে তিনি ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’।
আমরা এখন এমন যুগে বাস করছি, যেখানে একজন মানুষের পেশা ‘আমি’। এটি যে কারও আত্মপ্রকাশের অবাধ পরিসর। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্য দিয়ে যে নিঃশব্দ সমাজবিপ্লব ঘটে গেছে, তা প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা মুরুব্বিরা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেননি। তাঁদের কেউ কেউ এখনো মনে করেন, মোবাইল হাতে নিলেই জাতির সর্বনাশ। অবশ্য তাঁরা নিজেরা সেই বক্তব্যটি ফেসবুকে পোস্ট করেন।
এখানে গণতন্ত্র আছে—সবাই বলতে পারে। সমস্যা হলো, সবাই বলতে পারার অর্থ সবাই শুনতে বাধ্য নয়। তবু সবাই বলছে। কারণ বলা এখন শ্বাস নেওয়ার মতো সহজ। আর শোনা এখন ত্যাগের মতো কঠিন।
একসময় পাড়ার চায়ের দোকানে পাঁচজন বসে বিশ্বরাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন। এখন পাঁচ কোটি মানুষ একই সঙ্গে আলোচনা করেন।
প্রযুক্তি আমাদের পরিসর বড় করেছে, কিন্তু সহনশীলতা বড় করেনি।
সবচেয়ে বড় সমস্যার কথা, যে যোগাযোগমাধ্যমের নামের সঙ্গে ‘সামাজিক’ শব্দটি জড়িত, সেটিই অনেক সময় অসামাজিক কাজের অস্ত্র হয়ে উঠছে।
কাউকে ছোট করার জন্য তাঁর ছোটখাটো ত্রুটিকেও ফেসবুকে বড় করে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কেউ হোঁচট খেলেন—ভিডিও। কেউ ভুল বললেন—ক্লিপ। কেউ বিশ বছর আগে কী বলেছেন, সেটি খুঁড়ে বের করা হলো—পোস্ট। তারপর সবাই বিচারক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক অসাধারণ ক্ষমতা দিয়েছে, যেখানে তদন্তের আগে রায়, প্রমাণের আগে শাস্তি এবং সত্যের আগে ট্রেন্ড ঠিক হয়ে যায়।
লোকে সত্যাসত্য যাচাই ছাড়াই তা বিশ্বাস করছে। কারণ সত্য যাচাই করতে সময় লাগে। ক্ষুব্ধ হতে এক সেকেন্ড।
যেহেতু এখন ‘র’ কনটেন্টের কাটতি বেশি, সেহেতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই আপাত-সর্বময় বিশ্বাসযোগ্যতার ঘরে সিঁধ কেটে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কুমতলব ঢুকে পড়ছে। আগে মিথ্যা বানাতে দক্ষতা লাগত। এখন টেমপ্লেট আছে। আগে গুজব ছড়াতে লোক লাগত। এখন গ্রুপ আছে। আগে অপপ্রচার চালাতে সংবাদপত্র, মাইক বা সভা লাগত। এখন একটা ফোন এবং সামান্য ক্ষোভই যথেষ্ট।
কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়টি হলো—আমরা যত বেশি তথ্য পাচ্ছি, তত বেশি জানছি বলে মনে করছি। তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। যেমন বাজার থেকে চাল কিনলেই কেউ রাঁধুনি হয়ে যায় না, তেমনি পাঁচশ ভিডিও দেখলেই কেউ বিশেষজ্ঞ হয়ে যায় না।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য কোনো ডিগ্রি লাগে না। লাগে আত্মবিশ্বাস। আর আত্মবিশ্বাসের বাজারে সবচেয়ে বড় সত্য হলো—যে কম জানে, সে অনেক সময় বেশি জোরে কথা বলে।
তাহলে কি আমরা বিটিভির সেই একচেটিয়া যুগে ফিরে যেতে চাই? নিশ্চয়ই না। কেউ যদি আবার একটি চ্যানেল চালু করে রাত আটটায় বলে, ‘এখন সবাই সাপ্তাহিক নাটক দেখবেন’, তাহলে আজকের দর্শক নাটকের আগে তাঁকেই ‘নাটক’ দেখাবে।
বৈচিত্র্য দরকার। বিকল্প দরকার। স্বাধীনতা দরকার। প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার সঙ্গে কি বাছাই করার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে?
খাবারের দোকানে একশ পদের খাবার থাকা ভালো। কিন্তু সব খাবার একসঙ্গে প্লেটে তুলে খাওয়ার নাম রুচি নয়। বইয়ের দোকানে হাজার বই থাকা ভালো। কিন্তু সব বইয়ের মলাট দেখে জ্ঞানী হওয়ার উপায় নেই। পৃথিবীতে কোটি কোটি ভিডিও আছে। কিন্তু সব দেখে জীবনের রহস্য বোঝা যাবে না।
আমাদের সামনে এখন কনটেন্টের দুর্ভিক্ষ নয়, কনটেন্টের বন্যা। আর বন্যার মতোই এই প্রাচুর্য সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—রুচি, ধৈর্য, মনোযোগ, কখনো কখনো বিবেচনাবোধও।
একসময় আমরা ভালো জিনিসের অভাবে কষ্ট পেতাম। এখন ভালো জিনিস খুঁজে পেতে কষ্ট পাই। এটাই রুচির দুর্ভিক্ষ।
এখন প্রশ্ন, এই দুর্ভিক্ষের সমাধান কী? আবার বাঁশের আগায় অ্যান্টেনা বেঁধে ‘কিলিয়ার আইছে?’ বলে চিৎকার করা?
না।
সমাধান প্রযুক্তি ত্যাগে নয়, প্রযুক্তিকে হজম করতে শেখায়। প্রাচুর্যকে পরিত্যাগে নয়, প্রাচুর্যের মধ্যে বাছাইয়ের বোধ তৈরি করায়। সব কথা না শোনা, সব ভিডিও না দেখা, সব বিতর্কে না জড়ানো—এসবও এখন এক ধরনের আধুনিক জ্ঞান।
মানুষ যা খায়, তা-ই তার শরীর হয়—পুরোপুরি না হলেও কথাটা চলে। মানুষ যা দেখে, শোনে, বিশ্বাস করে, তার একটা অংশও সে হয়ে ওঠে। প্রতিদিন মস্তিষ্কে যা ঢোকাচ্ছি, তারও হজম আছে, বদহজম আছে।
কিন্তু আমরা খাওয়ার আগে যেমন দেখি খাবারটা বাসি কি না, কনটেন্টের ক্ষেত্রে তেমন দেখি না। যা সামনে আসে, গোগ্রাসে গিলি। তারপর মনের ভেতর ঢেকুর তুলি।
বিটিভির যুগে আমাদের খাবার কম ছিল। এখন খাবারের পাহাড়। তখন পেট ভরানো কঠিন ছিল; এখন হজম করাই কঠিন।
সুতরাং প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দরকার নেই। কারণ প্রযুক্তি আমাদের জীবনের ভেতরে ঢুকে গেছে। বরং তার সঙ্গে আমাদের রুচির একটি শান্তিচুক্তি দরকার। না হলে একদিন দেখা যাবে, আমাদের হাতের মুঠোয় সত্যিই বিশ্বজগৎ আছে—কিন্তু আমরা সেটি দেখার সময় পাচ্ছি না।
কারণ তখন আমরা সবাই রিল স্ক্রল করছি। আর কোথাও, কোনো অদৃশ্য ডিজিটাল দুনিয়ায় নজরুল হয়তো আবার লিখছেন—‘বিশ্বজগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে’—
তারপর একটু থেমে নিচে মন্তব্য করছেন—
‘কিন্তু বেশিক্ষণ মুঠো বন্ধ করে রাখিস না, ব্যাটারি কিন্তু শেষ হয়ে যাবে।’
Comments
Post a Comment