হাসিনার কৌশলে ধরা খেল ভারত
ভারতকে চাপে রাখার জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত হলো চীনের সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা চুক্তি। ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এটি একটি মাস্টারস্ট্রোক, যার মূল লক্ষ্য ছিল অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতকে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত উভয় সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করানো। তবে এই পুরো অধ্যায়ের সবচেয়ে মজার এবং চমকপ্রদ বিষয় হলো: ভারতের তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এই চুক্তির প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতিগুলো সম্পন্ন হয়েছিল শেখ হাসিনার শাসনামলে। আওয়ামী বিরোধী পক্ষ বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জনসম্মুখে শেখ হাসিনাকে ‘চরম ভারতপন্থী’ হিসেবে উপাধি দেওয়া হলেও, দিল্লির কূটনৈতিক একাধিপত্য ক্ষুণ্ন বা বলা চলে ভারতের ‘বিচি’ চেপে ধরার জন্য সবচেয়ে জাঁদরেল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তটি পর্দার আড়ালে শেখ হাসিনাই নিয়েছিলেন। হাসিনা পরবর্তী ইউনূস-বিএনপি সেই অস্ত্রটিই এখন ভারতের বিরুদ্ধে শাণিত করছে।
দিল্লিতে অপমানের প্রতিশোধ নিতেই ভারতপन्थী শেখ হাসিনা চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা সাজিয়ে ভারতকে এক কৌশলী ফাঁদে ফেলেছিলেন — ক্ষমতা বদলের পর এখন কীভাবে সেই একই অস্ত্র দিয়ে ভারতকে বাগে আনছে বাংলাদেশ?
হাসিনার নাটকীয় সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে এক গভীর ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় অপমানের ইতিহাস। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে যান। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে সেই সফরটি নির্ধারিত হয়েছিল, যার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল তিস্তা পানি চুক্তি। কিন্তু দিল্লিতে পৌঁছানোর পর শেখ হাসিনা এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণের মুখোমুখি হন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি তিস্তা চুক্তির প্রধান বিরোধিতাকারী, তিনি প্রটোকল ভেঙে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে রিসিভ করতে যাননি। এমনকি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো বড় নেতাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না; বরং সাধারণ একজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গ্রহণ করা হয়।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে ভারতের মাটিতে এই চরম অবমাননা ও তিস্তা চুক্তি নিয়ে দিল্লির দীর্ঘদিনের টালবাহানা শেখ হাসিনাকে তাঁর কূটনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করে।
২০১৭ সালের সেই সফর থেকে অপমানিত হয়ে ফেরত আসার পরপরই শেখ হাসিনা ভারতের ওপর একচ্ছত্র নির্ভরতা কাটানোর বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন এবং চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল অনুরোধ বা অনুনয় করে ভারতের কাছ থেকে তিস্তার পানি পাওয়া যাবে না; ভারতকে বাধ্য করতে হলে এমন এক শক্তিকে এই অববাহিকায় প্রবেশ করাতে হবে, যা দিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হবে। আর সেই শক্তিটি ছিল চীন। যদিও ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা এবং দিল্লির সঙ্গে দরকষাকষির (বারগেইনিং চিপ) হাতিয়ার হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন এই চুক্তিটিকে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু এর মূল নকশা ও প্রশাসনিক ভিত্তি তিনিই গড়ে যান। বর্তমানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর, বিএনপি নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় বর্তমান সরকার সেই ঝুলিয়ে রাখা বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত চীন-বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তিরই চূড়ান্ত বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভেতরে কী আছে?
চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ কোম্পানির তৈরি করা ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই মহাপরিকল্পনাটি সাজানো হয়েছে। এটি কেবল একটি সাধারণ নদী খনন প্রকল্প নয়, বরং নদীকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে রূপান্তরের একটি মেগা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট। এর মূল উপাদানের মধ্যে রয়েছে:
- নদী সংকীর্ণকরণ ও গভীরতা বৃদ্ধি: বর্তমানে তিস্তা নদী বর্ষাকালে কোনো কোনো জায়গায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার চওড়া হয়ে যায়, আবার শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়। এই পরিকল্পনায় নদীর চওড়া কমিয়ে ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটারের মধ্যে নিয়ে আসা হবে এবং আধুনিক ড্রেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে নদীর তলদেশ গভীরভাবে খনন করা হবে।
- রিভার ট্রেইনিং ও গাইড বাঁধ: নদীকে নির্দিষ্ট চ্যানেলে ধরে রাখার জন্য এর দুই পাড়ে প্রায় ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ কংক্রিটের তৈরি গাইড বাঁধ ও গ্রোইন (Groynes) নির্মাণ করা হবে। এর ফলে নদীভাঙন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
- বিশাল জলাধার ও ব্যারেজ: শুষ্ক মৌসুমের পানির সংকট মেটাতে নদীর বুকেই বিশাল আকৃতির কৃত্রিম জলাধার তৈরি করা হবে। বর্ষাকালের উদ্বৃত্ত পানি এই জলাধারে ধরে রাখা হবে, যা জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের খরা মৌসুমে উত্তরবঙ্গের কৃষিজমিতে সেচের জন্য সরবরাহ করা হবে।
- ভূমি পুনরুদ্ধার ও অর্থনৈতিক অঞ্চল: নদীকে সংকীর্ণ করার ফলে প্রায় কয়েক হাজার হেক্টর মূল্যবান ভূমি অবমুক্ত বা পুনরুদ্ধার হবে। এই উদ্ধারকৃত জমিতে আধুনিক স্যাটেলাইট টাউন, ইকোনমিক জোন (অর্থনৈতিক অঞ্চল), কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং বনায়ন গড়ে তোলা হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ কি আদৌ লাভবান হবে?
এই প্রশ্নটি বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিতর্ক। একদল বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এটি উত্তরবঙ্গের ভাগ্য বদলে দেবে, অন্যদিকে পরিবেশবাদীদের চোখে এটি একটি মহাবিপর্যয়ের সংকেত।
যদি এই প্রকল্প সফলভাবে কাজ করে, তবে উত্তরবঙ্গের খরাপ্রবণ জেলাগুলো (রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা) প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে। বর্ষার যে পানি আগে প্লাবন তৈরি করত, তা জলাধারে জমা থাকায় শুষ্ক মৌসুমে প্রায় আট হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ দেওয়া যাবে। এর ফলে দেশের খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বাড়বে। এছাড়া, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো চালু হলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে, যা ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাবে।
কিন্তু মুদ্রার ওপিঠ অত্যন্ত ভয়াবহ। নদী কোনো কৃত্রিম ড্রেন বা খাল নয় যে তাকে কংক্রিট দিয়ে বেঁধে ফেলা যাবে। নদীকে অতিরিক্ত গভীর করা হলে আশেপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটির নিচের পানি (গ্রাউন্ডওয়াটার) নদীর দিকে ধাবিত হবে। এতে উত্তরবঙ্গের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও দ্রুত নিচে নেমে যাবে, যা সাধারণ মানুষের সুপেয় পানির সংকট এবং অগভীর সেচ পাম্পগুলোকে অকেজো করে তুলবে।
তিস্তা নদী প্রতিবছর হিমালয় থেকে লাখ লাখ টন পাহাড়ি পলি ও বালি বয়ে নিয়ে আসে। নদীকে সংকীর্ণ করে দিলে এই পলিগুলো দ্রুত জলাধার এবং ব্যারেজের তলদেশে জমা হয়ে যাবে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই জলাধারের পানি ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে যেতে পারে এবং ড্রেজিং করার খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকবে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি টানতে পারবে না।
কৃত্রিম বাঁধ ও নদী শাসনের ফলে নদীর প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম বা জলজ জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। বহু দেশীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র বন্ধ হয়ে যাবে।
শেখ হাসিনার ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ ও নেদারল্যান্ডসের অন্তর্ভুক্তি
তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বলতে গেলে শেখ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে দূরদর্শী ও দীর্ঘমেয়াদী নীতি কাঠামো ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ বা বদ্বীপ পরিকল্পনার কথা বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। এটি ছিল নেদারল্যান্ডসকে সঙ্গে নিয়ে আগামী এক শতাব্দীর জন্য বাংলাদেশের পানি সম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই ডেল্টা প্ল্যানটি অনুমোদিত হয়।
বদ্বীপ বা ডেল্টা ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের জুড়ি মেলা ভার। দেশটির এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত। শত শত বছর ধরে তারা সমুদ্রের জোয়ার, জলোচ্ছ্বাস এবং প্রলয়ঙ্কারী বন্যার মুখোমুখি হয়ে আসছে। কিন্তু ডাচরা কেবল কংক্রিটের দেয়াল তুলে প্রকৃতিকে শাসন করার ভুল পথে হাঁটেনি; বরং তারা তৈরি করেছে বিশ্বখ্যাত ‘ডেল্টা ওয়ার্কস’ এবং আধুনিক ‘রুম ফর দ্য রিভার’ দর্শন। ডাচ পানি ব্যবস্থাপনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো—প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে, প্রকৃতির নিজস্ব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পানিকে পথ দেওয়া এবং একই সাথে পানির প্রবাহকে সুরক্ষিত রাখা। তাদের এই টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির কারণেই নেদারল্যান্ডসকে পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের গুরু মানা হয়।
শেখ হাসিনার শাসনামলের অন্যতম বড় দূরদর্শিতা ছিল এই ডেল্টা প্ল্যান প্রণয়নে নেদারল্যান্ডস সরকারকে সরাসরি কারিগরি ও আর্থিক অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা। ২০১২ সালে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। চিনের মতো কোনো একক মেগা-ইঞ্জিনিয়ারিং দেশের ওপর নির্ভর না করে ডাচ বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে শেখ হাসিনার কৌশল ছিল পরিষ্কার—বাংলাদেশ একটি জটিল বদ্বীপ, আর বদ্বীপের ক্ষত ও সম্ভাবনা ডাচদের চেয়ে ভালো কেউ বোঝে না। ডেল্টা প্ল্যানে সমগ্র বাংলাদেশকে ৬টি হটস্পটে ভাগ করা হয়েছিল, যার মধ্যে তিস্তা অববাহিকা ‘বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডেল্টা প্ল্যানে ডাচ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট সতর্ক করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত চুক্তির ওপর একক নির্ভরতা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তাই দেশের ভেতরেই পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শেখ হাসিনার এই ডেল্টা প্ল্যানের আলোকেই তিস্তায় বড় বড় ড্যাম এবং রিজার্ভার তৈরির আইডিয়াটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘যেকোনো মূল্যে’ বাস্তবায়নের ঘোষণা ও রাজনৈতিক রহস্য: ক্ষমতার পালাবদলের পর, ২০২৬ সালের জুনের শেষে জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক অভূতপূর্ব ও দৃঢ় ঘোষণা দেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই অনড় অবস্থানের পেছনে এক গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত রহস্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গের মানুষ পানির জন্য ভুগছে। বর্ষায় বন্যা আর শান্ত মৌসুমে খরায় তাদের জীবন বিপন্ন। তারেক রহমান এই প্রকল্পকে নিজের রাজনৈতিক ইশতেহার ও উত্তরবঙ্গের মানুষের অধিকার আদায়ের প্রধান প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
হাসিনা যেভাবে এই প্রকল্পকে ‘বারগেইনিং চিপ’ বা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, তারেক রহমান সেই পথে হাঁটছেন না। তিনি ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চান যে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারত যদি তিস্তার ন্যায্য হিস্যা না দেয়, তবে বাংলাদেশ তার নিজের সার্বভৌম সীমানার ভেতরে চীনের মতো পরাশক্তিকে নিয়ে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দ্বিধা করবে না।
একই সাথে তারেক রহমান ভারসাম্য বজায় রাখতে সংসদে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণেরও ঘোষণা দিয়েছেন, যাতে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যায়। তিনি ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের মহাপরিকল্পনাও প্রকাশ করেছেন, যার একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তিস্তা নিয়ে তার এই দৃঢ় অবস্থান দিল্লির কূটনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ডাচ বনাম চিনা মডেল: উপেক্ষা ও বাস্তবায়নের জটিল সমীকরণ
এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় মোড় বা টুইস্ট হলো এর টেকনিক্যাল বা কারিগরি দর্শন। শেখ হাসিনার ডেল্টা প্ল্যানটি তৈরি করা হয়েছিল নেদারল্যান্ডসের প্রকৃতি-বান্ধব দর্শনে, অথচ তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল প্রকৌশল নকশাটি করা হয়েছে সম্পূর্ণ চিনা মডেলে (পাওয়ার চায়না কোম্পানির মাধ্যমে)। এখানেই তৈরি হয় একটি বড় বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব এবং সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার এখন কতটা ডাচ পরামর্শ মানবে আর কতটা চিনা মডেলে কাজ করবে?
যদি বর্তমান সরকার ভূ-রাজনৈতিক তাড়াহুড়ো বা চিনা ঋণের সহজলভ্যতার কারণে ডাচ বিশেষজ্ঞদের ‘রুম ফর দ্য রিভার’ এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সংক্রান্ত পরামর্শ পুরোপুরি উপেক্ষা করে, তবে তা উত্তরবঙ্গের জন্য এক পরিবেশগত ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’ বা মৃত্যুফাঁদ হতে পারে। বাংলাদেশের পলিমাটি আর চিনের পাহাড়ি পাথুরে মাটির গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন। চিনের হোয়াংহো নদী শাসনের মডেল তিস্তায় হুবহু প্রয়োগ করলে নদীটি কয়েক বছরের মধ্যে মৃত খালে পরিণত হবে এবং মাটির নিচের পানির স্তর নেমে গিয়ে পুরো উত্তরবঙ্গ মরুভূমিতে রূপ নিতে পারে।
সরকারের বর্তমান কৌশল
বাস্তবতা হলো, সরকার সম্পূর্ণ চিনা মডেলও ছাড়তে পারছে না, আবার ডাচদের বিজ্ঞানকেও ফেলে দিতে পারছে না। ফলে বর্তমান সরকারের নীতিগত অবস্থান হচ্ছে একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ তৈরি করা। তারেক রহমানের সরকার চিনের অর্থায়ন এবং ভারী প্রকৌশল (যেমন মেগা ড্রেজিং ও রিভার ট্রেইনিং) ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু সেই নকশাটিকে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য ডাচ বিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ কারিগরি টিম যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। সরকার চাইছে নদীর চওড়া চিনের প্রস্তাব অনুযায়ী একেবারে ৭০০ মিটারে টেনে না এনে ডাচদের পরামর্শ মেনে কিছুটা বেশি রাখা, যাতে নদীর নাব্যতা ও পলির স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট না হয়।
শেষ পর্যন্ত এই তিস্তা মহাপরিকল্পনার ফল কী হবে, তা চরমভাবে অনিশ্চিত। এটি কি উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ হবে, নাকি এটি বাংলাদেশকে চিনের ঋণফাঁদে ফেলবে এবং এক পরিবেশগত মরুভূমি বা স্থায়ী জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দেবে—তার উত্তর কেবল সময়ই দিতে পারবে।
ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার এই চুক্তি বাস্তবায়ন করে ভারতকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত বার্তা দিতে পারছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় প্রকৃতির নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে। ভারতের উজান থেকে যদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বা কৃত্রিমভাবে পানি প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে চিনের তৈরি কোটি কোটি ডলারের এই কৃত্রিম জলাধার ও বাঁধ শুকিয়ে তপ্ত বালুচরে পরিণত হবে। ভারতের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে এই তিস্তা চুক্তি হয়তো সফল, কিন্তু প্রকৃতির দরবারে ভূ-রাজনীতি নয়, বরং পরিবেশগত বিজ্ঞানই শেষ কথা বলে। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে এই মহাপরিকল্পনার এক গভীর ও অন্ধকার অনিশ্চয়তা। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে তার দায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপি সরকারকেই বহন করতে হবে।
Comments
Post a Comment