বাঙালির ইংরেজিয়ানা
‘টু-লেট: চেমি পাকা, ডাবল ও চিগেল ফেমিলি’, ‘ভাই ভাই ভাতের হোটেল অ্যান্ড মোরগ পোলাও রেষ্ঠুরেন্ড’—এই ধরনের বিজ্ঞাপন অলিগলির দেয়ালে হরেদরে ঝুলে থাকে। ভাষার শবযাত্রার এই ব্যানারগুলো দেখে বোঝা যায়, বাংলা এখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর ইংরেজিয়ানা এসে তার বুকের ওপর পা তুলে বসেছে।
গলির ভেতর টিনের সাইনবোর্ডে বাংলা অক্ষরে ইংরেজি লেখা দেখে শেক্সপিয়র বেঁচে থাকলে দ্বিতীয়বার মারা যেতেন, বিদ্যাসাগর থাকলে চুপচাপ লণ্ঠন নিভিয়ে বসে থাকতেন।
চিপাচাপা গলিতে বাংলা হরফে ইংরেজি বিকৃতির এই কারখানা যেমন জমজমাট, তেমনি গুলশান-বনানীর ঝকঝকে কাঁচের অট্টালিকায় আবার ঠিক উল্টো দৃশ্য। সেখানে বাংলা নাম থাকলেও তা বাংলা হরফে লেখা লজ্জার। তাই তাকে রোমান হরফে সাজিয়ে দেওয়া হয়, যেন বাংলা ভাষা নিজেই নিজের পরিচয় দিতে লজ্জা পাচ্ছে। যেন বাংলা অক্ষর মানেই নিম্নবিত্ত, আর রোমান হরফ মানেই রুচিশীলতা, আধুনিকতা, ‘ক্লাস’।
করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কার হয়েছে, প্লেগ-কলেরাও ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। কিন্তু এই টাল্টুবাল্টু ইংরেজিয়ানার খোসপাঁচড়া এখনো অব্যর্থভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে এমন সংক্রামক রোগ, যার কোনো ভ্যাকসিন নেই, কোনো কোয়ারেন্টিন নেই। এই রোগ যত বেশি ছড়ায়, তত বেশি সম্মান পায়। সমাজের গায়ে এখন এই রোগের ‘গুটি’ উঠেছে। যেখানে সেখানে, হঠাৎ হঠাৎ, বিনা কারণে ইংরেজি শব্দ বসানোর অদম্য ইচ্ছা সবাইকে পেয়ে বসেছে। কথার ফাঁকে ‘সো’, ‘এনিওয়ে’, ‘বাট’, ‘বাই দ্য ওয়ে’ ঢুকিয়ে না বললে যেন বাক্যটা সম্পূর্ণ হয় না, ভাবটা পূর্ণতা পায় না, ব্যক্তিত্বটা আন্তর্জাতিক হয় না!
একটা সময় ছিল, যখন বাংলা ভাষা নিজের পায়ে দাঁড়াত, নিজের জোরে কথা বলত। দোকানের নাম বাংলায় লেখা থাকত। হোটেলের সাইনবোর্ডে বাংলার গন্ধ থাকত। অফিস-আদালতের ফলকে নিজের ভাষার স্বাভাবিক উপস্থিতি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন এক সাংস্কৃতিক ভূমিকম্প হলো—বাংলা হরফ উধাও হতে শুরু করল, আর রোমান হরফ এসে জায়গা দখল করল। ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’র মতো করে শহরের মুখ ঢেকে গেল ইংরেজি নামফলকে—যেখানে বাংলা থাকলেও তা নিজের চেহারায় নয়, ছদ্মবেশে।
এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের নামফলক রোমান হরফে না লিখলে যেন তার মর্যাদা কমে যায়। যেন বাংলা হরফে নাম লিখলে প্রতিষ্ঠানটা হঠাৎ করেই এক ধাপ নিচে নেমে যায়। হয়ে যায় গ্রাম্য, সেকেলে, অপ্রাসঙ্গিক। ইংরেজি হয়ে উঠেছে এক মহামূল্য ‘স্টেটাস সিম্বল’। এটি এক ধরনের ভাষিক ব্র্যান্ড, যা ব্যবহার করলে মানুষ নিজেকে একটু বেশি ‘আপগ্রেডেড’ মনে করে।
সমস্যাটা ইংরেজি শেখা বা ব্যবহার করা নয়। সমস্যাটা হলো, ইংরেজিকে আমরা অতিথি থেকে গৃহকর্তা বানিয়ে ফেলেছি। একসময় তাকে বিলেতি অতিথি ভেবে সম্মান দিয়ে বাংলার শীতলপাটি পাতা চৌকিতে শুতে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, অতিথি এসে কিছুদিন থাকবে, তারপর চলে যাবে। কিন্তু সেই অতিথি এখন বিছানা-বালিশ দখল করে বসেছে, পা তুলে আরাম করছে, আর বাংলাকে ধাক্কা মেরে বলছে—‘তুমি একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াও, আমার একটু স্পেস দরকার।’ বাংলা ভাষা এখন নিজের ঘরেই গেস্ট। ইংরেজি হয়ে উঠেছে গৃহস্বামী।
এই যে উল্টে যাওয়া সম্পর্ক, এই যে ভাষার ভেতরে লুকিয়ে থাকা হীনমন্যতা, এই যে নিজেরটাকে ছোট আর পরেরটাকে বড় ভাবার প্রবণতা—এটাই আসল রোগ। এই রোগে আক্রান্ত রোগীরাই ‘চিগেল ফেমিলি’ লিখে ঘর ভাড়া দেয়, আর ‘রেষ্ঠুরেন্ড’ লিখে খদ্দের খাওয়ায়।
সাইনবোর্ডের এই ভাষিক কাণ্ডকারখানা দেখে এক ভদ্রলোক একদিন ঠিক করলেন—এভাবে আর চলতে পারে না। ভাষার জন্য একপ্রকার আইসিইউ বেড জোগাড় করতে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হলেন। ফলাফলও এলো। ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আদালত বেশ গম্ভীর গলায় বলে দিলেন, বিদেশি দূতাবাস আর কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাদে দেশে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, দপ্তরের নামফলক—সব বাংলায় হতে হবে। এমনকি গণমাধ্যমেও ইংরেজি বিজ্ঞাপন আর এই মিশ্র ভাষার ‘খিচুড়ি’ বন্ধ করতে হবে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও তখন তৎপরতার এমন অভিনয় করল, যেন ভাষা বাঁচানো তাদের জন্মগত দায়িত্ব। নির্দেশ জারি হলো, সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাইনবোর্ড বাংলায় করবে। সেই সময় দেখে মনে হয়েছিল, এবার রোমান হরফের দাপট একটু কমবে, বাংলা আবার নিজের ঘরে একটু জায়গা পাবে।
তারপর? তারপর যা হয়, তাই হলো। বাংলাদেশি বাস্তবতা নামের যে অদৃশ্য স্ক্রিপ্ট আছে, সেখানে প্রথম দৃশ্য খুব নাটকীয়, আর শেষ দৃশ্য চুপচাপ উধাও। কয়েক বছর পার হয়ে গেল, নির্দেশ কাগজে রইল, বাস্তবে রইল না। এই সময়ের মধ্যে শহরে যত নতুন সাইনবোর্ড উঠেছে, সেগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় আদালতের নির্দেশ হলো এক ধরনের সাহিত্য—পড়া যায়, মানা যায় না।
এখন সাইনবোর্ডে ইংরেজি নাম বাংলা হরফে, বাংলা নাম রোমান হরফে। কোথাও কোথাও দুইয়ের এমন মিশেল যে ভাষাবিদরা দেখলে ‘সমকালীন বিভ্রান্ত লিপিবিজ্ঞান’ নামে ভাষাবিজ্ঞানের নতুন শাখা খুলতে বাধ্য হবেন।
রাজধানীর যেকোনো রাস্তায় হাঁটুন—মনে হবে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসলে যায়নি, শুধু পোশাক পাল্টে সাইনবোর্ডে বসেছে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নামফলকে ইংরেজি এমন ভঙ্গিতে বসে থাকে, যেন সে এখানকার জমিদার, আর বাংলা তার খাসমহলের প্রজা। চারদিকে ইংরেজি নামের ঝলকানি—বিলবোর্ড, ব্যানার, দোকানের সাইন—সবখানে সেই একই মাতব্বরি ভাব।
অবশ্য সরকারি দপ্তরগুলো একটু ভদ্রতা দেখিয়েছে। তাদের সাইনবোর্ড এখন বেশির ভাগই বাংলায়। যানবাহনের ডিজিটাল নম্বরপ্লেটও বাংলায় এসেছে। মানে, রাষ্ট্র নিজে অন্তত নিজের দরজায় বাংলা লিখে রেখেছে। তবে পাশের গলিতে গিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সেই দরজার ভেতরের লোকজনই বাইরে ইংরেজির ব্যানার টাঙাতে বেশি স্বচ্ছন্দ।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এত বছর পরও অনেকেই জানেন না যে এমন কোনো আদালতের নির্দেশ ছিল। ব্যবসা সনদ নিতে গেলে সিটি করপোরেশন নাকি লিখেও দেয়—‘সাইনবোর্ড/ব্যানার বাংলায় লিখতে হবে’। কিন্তু সেই লাইনটা হয়তো সনদের সবচেয়ে কম পঠিত অংশ।
আপনি যদি কোনো দোকানদারকে জিজ্ঞেস করেন—‘ভাই, নাম ইংরেজিতে দিলেন কেন?’ উত্তর পাবেন: ‘ভাইরে, আমার ব্র্যান্ডের নাম ইংরেজিতে, লোগো ইংরেজিতে, আমি এখন সাইনবোর্ড বাংলায় করব কেমনে?’
এই উত্তরের ভেতরে এক ধরনের নিরুপায়তা আছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে আত্মসমর্পণ। বাংলা হরফ ব্যবহার করলেই যেন ব্র্যান্ডের মর্যাদা কমে যাবে, ব্যবসা ধসে পড়বে, ক্রেতারা পালাবে। যেন বাংলা কোনো ভাষা নয়, বাংলা যেন এক ধরনের ঝুঁকি।
আইন আছে, শাস্তির ব্যবস্থাও আছে, প্রয়োগ নেই। কারণ প্রয়োগ করতে গেলে যে ‘অসুবিধা’ হয়—সেটা হলো, তখন এই সমাজের আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে হবে। আর আমরা তো আয়না এড়াতেই ভালোবাসি।
ভাষা কিন্তু শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটা আত্মপরিচয়ের বাহক। নিজের হরফেই ভাষা বেঁচে থাকে, নিজের লিপিতেই তার ইতিহাস, তার আবেগ, তার সংগ্রাম জমা থাকে।
বাংলার মতো ভাষা পৃথিবীতে বিরল—যার হরফের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে। আমরা সেই হরফকে এখন ধীরে ধীরে ‘অপশনাল’ বানিয়ে ফেলছি। এটা এমন এক বীতরাগ, যা সত্যিই ‘ধম্মে সইবে না’। কিন্তু ‘ধম্মের’ জায়গায় এখন এসেছে ‘স্টাইল’, ‘প্রেজেন্টেশন’, ‘গ্লোবাল লুক’।
এখন বাবা-মায়েরা সন্তানের বাংলা শেখা নিয়ে ততটা চিন্তিত নন, যতটা চিন্তিত তার ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে। সন্তান যদি বাংলায় সাবলীল না হয়—সমস্যা নেই। কিন্তু যদি ইংরেজি অ্যাকসেন্টে বাংলা বলে, তখন বুক ভরে গর্ব আসে। যেন মাতৃভাষাকে একটু বাঁকিয়ে বলাই আধুনিকতার প্রমাণ। বাংলা শেখানোর জন্য উৎসাহ নেই, উদ্যোগ নেই। ইংরেজি শেখানোর জন্য কোচিং, অ্যাপ, ইউটিউব, স্পোকেন ক্লাস—সব আছে।
দুই শ বছর আগে উইলিয়াম কেরি নামের এক বিদেশি এই বাংলার মাটিতে এসে বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র ছাপার জন্য ছাপাখানা বসিয়েছিলেন। তিনি তখন বাংলা ভাষার সম্ভাবনা দেখেছিলেন। আর আমরা, এই ভাষার উত্তরাধিকারী হয়ে, সেই ভাষাকেই এখন সাজিয়ে-গুছিয়ে অন্যের ছাঁচে ঢোকাতে ব্যস্ত।
ইতিহাসের একটা মজার বৈপরীত্য আছে—যে লোকটা নিজের মুখে উর্দু জোড়া লাগাতে পারতেন না, যাঁর ইংরেজি বক্তৃতা উর্দুতে অনুবাদ করে শোনানোর জন্য পাশে আলাদা লোক দাঁড় করাতে হতো, সেই জিন্নাহ সাহেবই একসময় আমাদের বলেছিলেন—‘এই নাও, উর্দু, এটা তোমাদের ভাষা!’
আমরা মেনে নেইনি। আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম, বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলাম, বলেছিলাম—ভাষা চাপিয়ে দিলে চলবে না, লিপির অসম্মান হলে মানা হবে না।
সেদিন আমরা ‘না’ বলতে জানতাম।
আজ আমরা ‘ওকে, ফাইন’ বলতে শিখেছি।
পৌনে এক শতাব্দী কেটে গেছে। এখন দৃশ্যটা এমন—কেউ আমাদের জোর করে কিছু চাপিয়ে দিচ্ছে না। আমরা নিজেরাই ট্রে হাতে নিয়ে বলছি—‘স্যার, আরেকটু ইংরেজি দেবেন? একটু এক্সট্রা হলে ভালো হয়!’
ভাষার স্বাধীনতা এখন সেলফ-সার্ভিস কাউন্টার। ধরুন, আপনি খুব সম্মান নিয়ে একটা বহুজাতিক ব্যাংকে গেলেন—ঋণ নেবেন। ব্যাংক আপনাকে হাসিমুখে একটা মোটা ফাইল ধরিয়ে দিল। ভেতরে কয়েক পাতার দলিল—ছোট ছোট অক্ষরে লেখা শর্তাবলি। সব ইংরেজিতে। আপনি ইংরেজি ‘মোটামুটি বুঝি’ ক্যাটাগরির মানুষ। মানে, ‘গুড মর্নিং’ বলতে পারেন, ‘থ্যাংক ইউ’ বলতে পারেন, কিন্তু ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস্ অপ্ল্যাই’ দেখলেই বুক ধড়ফড় করে।
তবুও আপনি কাগজপত্রে সই করলেন। কারণ সই না করলে ঋণ মিলবে না। কয়েক মাস পর হঠাৎ দেখলেন, হিসাব মিলছে না। আপনি গেলেন ব্যাংকে—‘ভাই, এ রকম তো কথা ছিল না!’
ব্যাংক তখন চশমা ঠিক করে ঠান্ডা গলায় বলবে—‘এ রকমই কথা ছিল। আপনি সব পড়ে সই করেছেন।’ এই ‘পড়ে সই করেছেন’ বাক্যটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক বাঙালির ট্র্যাজেডি। আমরা পড়ি না, বুঝি না, তবুও সই করি—কারণ ভাষাটা আমাদের না। তারপর যখন বুঝি ঠকেছি, তখন দোষ দিই সিস্টেমকে। কিন্তু সিস্টেম তো আগেই ইংরেজিতে লিখে রেখেছিল। আপনিই পড়েননি; কারণ আপনি ধরেই নিয়েছেন, ‘ইংরেজিতে যেহেতু লিখেছে, তাহলে ঠিকই লিখেছে।’
Comments
Post a Comment