মূল কনটেন্টে যান
ভিডিও মানে অন্যেরকল্পনা দেখা
পড়া মানে নিজেরকল্পনা গড়া
পড়ুন, কারণ টেক্সটভাবনার অবকাশ দেয়
সর্বশেষ

    ডিজিটাল ঘাম ও সস্তা শ্রম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাদুকরী পর্দার আড়ালে চরম অন্ধকার

    ডিজিটাল ঘাম ও সস্তা শ্রম — এআই অলংকরণ

    অলংকরণ: এআই

    বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় চমকের নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি বা গুগলের জেমিনির মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তিগুলো আমাদের দৈনন্দিন কাজকে জাদুর মতো সহজ করে দিচ্ছে। একটি সাধারণ নির্দেশ দিলেই চোখের পলকে চমৎকার সব ছবি, তথ্যবহুল প্রবন্ধ বা জটিল প্রোগ্রামিং কোড তৈরি হয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিস্ময়কর ক্ষমতা দেখে গোটা পৃথিবী আজ মুগ্ধ। কিন্তু এই মেধার পেছনের সত্যটি মোটেও কোনো জাদুকরী রূপকথা নয়; বরং তা তৃতীয় বিশ্বের লাখ লাখ তরুণের রক্ত, ঘাম আর চরম শোষণের এক নির্মম উপাখ্যান।

    “আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাদুকরী আউটপুট দেখে হাততালি দিই, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত—এর উজ্জ্বল পর্দার ওপাশে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর কোনো এক নিঃস্ব তরুণ শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস, নীরব কান্না আর চরম মানসিক ট্রমা।”

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে থেকে কিছুই শেখে না। তাকে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পিক্সেল ধরে ধরে শেখাতে হয়। একটি গাণিতিক অ্যালগরিদমকে স্মার্ট এবং নির্ভুল করতে হলে তাকে কোটি কোটি তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। আর এই বিপুল তথ্যভাণ্ডার যাচাই-বাছাই করা, ছবি শনাক্ত করা এবং তাতে সঠিক পরিচিতি জুড়ে দেওয়ার জটিল কাজটি পর্দার আড়ালে বসে করেন রক্ত-মাংসের মানুষ। প্রযুক্তি দুনিয়ায় এই অমানুষিক প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় তথ্য বিন্যাস বা তথ্য পরিচিতিকরণ।

    আশ্চর্যের বিষয় হলো, সিলিকন ভ্যালির শতকোটি ডলারের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে আছে বৈশ্বিক দক্ষিণের—অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার লাখ লাখ স্বল্পমজুরির শ্রমিকের কাঁধের ওপর। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে মানবাধিকার গবেষকেরা একে চিহ্নিত করছেন ‘ডিজিটাল দাসপ্রথা’ বা ‘ডিজিটাল ঘাম ঝরানো কারখানা’ হিসেবে।

    ঘণ্টাপ্রতি পারিশ্রমিকের আকাশ-পাতাল ব্যবধান

    সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিন, বিবিসি এবং গার্ডিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ডিজিটাল কারখানার ভয়াবহ চিত্রটি উন্মোচিত হয়েছে। কেনিয়া, ফিলিপাইন, ভারত কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী প্রতিদিন কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে একটানা আট থেকে দশ ঘণ্টা তথ্য বিন্যাসের কাজ করছেন।

    কেনিয়ায় ওপেনএআই-এর তথ্য বিন্যাসকারীদের নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের এক ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কৃত্রিম মেধার কথোপকথন ব্যবস্থাকে ‘নিরাপদ ও শালীন’ করতে গিয়ে সেখানকার কর্মীরা চরম মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন। কৃত্রিম মেধা যাতে শিশু নির্যাতন, নৃশংস হত্যাকাণ্ড, জাতিগত সহিংসতা কিংবা বর্ণবাদের মতো ক্ষতিকর বিষয়গুলো নিজ থেকে পরিহার করতে পারে, সে জন্য কেনিয়ার ওই কর্মীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসব ভয়ংকর লেখা এবং বিকৃত ও রক্তাক্ত ছবি দেখতে হয়েছে, সেগুলোতে সতর্কতা চিহ্ন বসাতে হয়েছে। আর এই নারকীয় ও বিবেক নাড়িয়ে দেওয়া কাজের বিনিময়ে তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে ঘণ্টায় মাত্র দুই ডলারেরও কম!

    কেনিয়ান মানবাধিকার কর্মী নারিমা ওয়াকো ওজিওয়া একটি নিবন্ধে এই পরিস্থিতিকে ‘আধুনিক যুগের ক্রীতদাস ব্যবস্থা’ বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই ডিজিটাল কারখানাগুলোতে কর্মীদের কোনো চাকরির নিরাপত্তা নেই, কাজের পরিবেশ চরম অমানবিক এবং একটি ক্ষুদ্র ভুলের কারণে বিনা নোটিশে তাদের কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কর্মীরা দিনের পর দিন যে নারকীয় ট্রমা ও বিষণ্নতার মধ্য দিয়ে যান, তা নিরাময়ের জন্য সেখানে নামমাত্র সহায়তা দেওয়া হয়, যা বাস্তবতার তুলনায় একেবারেই উপহাসের মতো।

    আধুনিক ডিজিটাল দাসপ্রথার অদৃশ্য ফাঁদ

    অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে এই ডিজিটাল কারখানার কাঠামোটি আধুনিক করপোরেট পুঁজিবাদের এক কুৎসিত চেহারা প্রকাশ করে। পশ্চিমা প্রযুক্তি পরাশক্তিগুলো সরাসরি এই শ্রমিকদের নিয়োগ দেয় না। তারা মধ্যস্বত্বভোগী বা বাইরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কাজ করায়। এর ফলে একদিকে যেমন তারা পানির দরে মানুষের মেধা ও শ্রম কিনে নিতে পারে, অন্যদিকে আইনি বা নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেও নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত রাখে।

    অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের মতো বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এই প্ল্যাটফর্মভিত্তিক মুক্তপেশার শোষণ নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে। এই ডিজিটাল শ্রমিকদের প্রযুক্তিবিদরা যতই ‘প্রক্রিয়ার ভেতরের মানুষ’ বলে আখ্যা দিন না কেন, বাস্তবে তারা হলেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অদৃশ্য কারিগর। তাদের ঘাম ছাড়া কৃত্রিম মেধার এই বিশাল সৌধ এক মুহূর্তও টিকতে পারে না। অথচ কৃত্রিম মেধার এই কোটি কোটি ডলারের মুনাফা কিংবা খ্যাতির একটি কণাও এই শ্রমিকদের ভাগ্যে জোটে না।

    এর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। যখন একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ (যেমন কেনিয়ায় গণিতে স্নাতক সম্পন্ন করা নাফতালি ওয়ামবালো) স্রেফ বেঁচে থাকার তাগিদে দিনের পর দিন পর্দার দিকে তাকিয়ে ছবির চারদিকে বাক্স আঁকার মতো একঘেয়ে কাজ করেন কিংবা বীভৎস ছবি ফিল্টার করেন, তখন ধীরে ধীরে তার নিজস্ব সৃজনশীলতা, চিন্তা করার ক্ষমতা এবং স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্য ধ্বংস হয়ে যায়। সে পরিণত হয় যন্ত্রের আরেকটি প্রাণহীন যন্ত্রাংশে।

    এটি আসলে সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক শোষণেরই একটি নতুন ডিজিটাল রূপ। ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসকেরা যেমন একসময় এশিয়া ও আফ্রিকার কাঁচামাল এবং সস্তা শ্রম লুট করে নিজেদের দেশে শিল্পবিপ্লব ঘটিয়েছিল, আজকের পশ্চিমা টেক জায়ান্টরাও ঠিক একইভাবে তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পমজুরির বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম শোষণ করে নিজেদের কৃত্রিম মেধার সাম্রাজ্য বিস্তার করছে।

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো আমাদের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর যদি স্থাপিত হয় চরম শোষণ, অবমূল্যায়ন আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর, তবে সেই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য কখনোই প্রকৃত আশীর্বাদ হতে পারে না। আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাদুকরী আউটপুট দেখে করতালি দিই, তখন আমাদের মনে রাখা কর্তব্য—এর উজ্জ্বল পর্দার ওপাশে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর কোনো এক নিঃস্ব শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস, নীরব কান্না আর রক্ত জল করা ঘাম। ডিজিটাল এই শোষণ আর অদৃশ্য দাসপ্রথা রুখে দাঁড়াতে না পারলে, প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি চরম অমানবিক সমাজ উপহার দেবে।

    সম্পর্কিত প্রতিবেদন

    Comments