মূল কনটেন্টে যান
ভিডিও মানে অন্যেরকল্পনা দেখা
পড়া মানে নিজেরকল্পনা গড়া
পড়ুন, কারণ টেক্সটভাবনার অবকাশ দেয়
সর্বশেষ

    পিয়ারের বন্ধু-ইয়ার! হ্যাপি নিউ ইয়ার!

    সাহেবেরা বিদায় নিলেও নানা কায়দার সাহেবিয়ানা বাঙালিয়ানায় অঙ্গীভূত হয়েছে। বাংলা ভাষার বৈঠকখানায় অনেক ইংরেজি শব্দ দূরসম্পর্কের নিকটাত্মীয়ের মতো বিরাট কুটুম্বিতার দাবি নিয়ে এমনভাবে গদি গেড়ে বসে গেছে যে তাদের সেই গদি ছেড়ে উঠে যেতে বলার অবস্থা আর নেই। তারা এখন বাঙালির ‘আপনার চেয়ে আপন যে জন’ হয়ে উঠেছে। এ কারণে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ কথাটিকে এখন আর বিলেতি ভাষাজ্ঞানে পর করে দিতে মনে সায় দেয় না। ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ এখন আর বিদেশি বাক্য নয়—এ যেন পাড়ারই ছেলে, একটু ফরসা, একটু ফ্যাশনেবল, তাই তাকে বেশি আদর।

    ‘একত্রিংশ রজনী’—কী রাজকীয়, কী রসালো, কী রোমান্টিক শব্দ! কিন্তু এই কথাটার ইংরেজি কী—এই প্রশ্ন করলে শিক্ষিত সমাজের শিক্ষিত অংশও খানিক থতমত খেয়ে যায়। অথচ ‘থার্টি–ফার্স্ট নাইট’ বললেই যেন মাথার ভেতর হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। ‘একত্রিংশ রজনী’ কথাটার ইংরেজি কী? লেখাপড়া জানা অনেককে আমি নিজে এই প্রশ্ন করে দেখেছি। তাঁদের একটা বড় অংশই বলতে পারেনি। কিন্তু যেই বলেছি ‘থার্টি-ফার্স্ট নাইট’, ওমনি তারা ভিরমি খাওয়ার মতো চমকে গিয়ে থমকে থেকেছে। তারপর ফিক করে হেসে ফেলেছে। তাঁদের কথা থেকে বুঝতে পেরেছি, ‘থার্টি-ফার্স্ট নাইট’ কথাটার যে একটি বাংলা অর্থ থাকতে পারে, সেটাই তাঁদের মাথায় ছিল না। ‘একত্রিংশ রজনী’ যেন সেই ছেলেটা যে কিনা গামছা পরে পাঁচতারা হোটেলে ঢুকে পড়েছে। ‘থার্টি-ফার্স্ট নাইট’ হলো সেই একই ছেলে যে কিনা স্যুট-টাই পরে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দরজা ঠেলে সেই হোটেলে ঢুকে যায়।

    গ্রামগঞ্জের তরুণও ‘থার্টি–ফার্স্ট নাইট’কে এতটাই চেনে যে, ‘একত্রিংশ রজনী’ শুনলে সে ভেবে বসতে পারে—এটা কি কোনো পালাগানের নাম, নাকি পুরনো কোনো কাব্যের চরিত্র? সম্ভবত সে জানে, ‘যে দিবাগত মধ্যরজনীতে বোমাসদৃশ কালিপটকার ব্রহ্মাণ্ডবিদারী নিনাদ ও অযুত আতশবাজির উল্লাসমুখর আলোকোজ্জ্বল আয়োজনে সদ্যাগত ইংরেজি বর্ষকে “হ্যাপি নিউ ইয়ার” ওঙ্কারধ্বনিসহযোগে স্বাগত জানানো হয়, উহাকে থার্টি–ফার্স্ট নাইট বলা হইয়া থাকে।’ ওই রাতে বহু আনন্দ আয়োজন হয়। অনেক জায়গায় ফানুস ওড়ানো হয়।

    রাজধানীর বাইরেও জমকালো আয়োজনে বাজি ফোটানো হয়। রাত ১২টা ১ মিনিট হলেই পরস্পরের মধ্যে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ—সব জায়গায় “হ্যাপি নিউ ইয়ার” এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেন ডিজিটাল দুনিয়ায় হঠাৎ করে শুভেচ্ছার মহামারি লেগেছে। কেউ টাইপ করতে চায় না—কার্ড ফরোয়ার্ড করে। এতে বানান ভুলের ঝামেলা নেই, ভাব প্রকাশের দায় নেই—শুধু ক্লিক করো, পাঠাও। দায়িত্ব শেষ। শুভেচ্ছাও এখানে শর্টকাটে চলে।

    এই “হ্যাপি নিউ ইয়ার”-এর ভেতরে কিন্তু একটা গভীর প্রত্যাশা থাকে—খুশির, শান্তির, স্বস্তির। মানুষ চায়, নতুন বছরটা একটু ভালো কাটুক, একটু কম কষ্টে কাটুক। কিন্তু বাস্তবতা? সে তো এই আশার গায়ে এসে কাঁটা বসায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মহামারির ক্ষত এখনো শুকায়নি, তার ওপর যুদ্ধের আগুন—রাশিয়া-ইউক্রেনের লড়াইয়ের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক বাজারে বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আছে। অর্থনৈতিক কুস্তিতে জ্বালানির দামে আগুন ধরেছে। খাদ্যের সরবরাহ ছিন্নভিন্ন। ডলারের দাম আকাশচুম্বী।

    এর ঢেউ এসে লাগে আমাদের ঘরেও। প্রবাসীরা কাজ হারিয়ে ফিরে আসে। ঘরে বসে হিসাব মেলে না। পকেটে টান পড়ে। তার ওপর এক ধাক্কায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে প্রায় অর্ধেক। মানুষের দাঁত কাঁপে। এলসি সংকট, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণের খবর—সব মিলিয়ে অর্থনীতি অদৃশ্য ঝড়ে টালমাটাল।

    রাজনীতির আকাশও মেঘমুক্ত নয়—সমাবেশ, উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অবস্থান—সব মিলিয়ে বাতাসে একটা চাপা কাঁপুনি। সাধারণ মানুষের গলায় যেন এক অদৃশ্য দলা—উৎকণ্ঠার, অনিশ্চয়তার, অস্বস্তির। তবুও সেই মানুষকেই হাসিমুখে বলতে হয়—‘হ্যাপি নিউ ইয়ার!’ বলতে হয় বন্ধুকে, আত্মীয়কে, সহকর্মীকে—সবাইকে।

    তবে যেহেতু প্যানডোরার বাক্স থেকে দুঃখ, জরা, ব্যাধি—এসব বের হলেও ‘আশা’ বের হতে পারেনি, তাই আমরা নৈরাশ্যবাদী হতে পারি না। আমরা আশাবাদী। আশা ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না, আর স্যাটায়ার ছাড়া সত্য বলা যায় না।

    সম্পর্কিত প্রতিবেদন

    Comments