মূল কনটেন্টে যান
ভিডিও মানে অন্যেরকল্পনা দেখা
পড়া মানে নিজেরকল্পনা গড়া
পড়ুন, কারণ টেক্সটভাবনার অবকাশ দেয়
সর্বশেষ

    ইজ্জত ফিরে পাক জীবনের মূল‘ধোন’

    ইজ্জত ফিরে পাক জীবনের মূল‘ধোন’

    মানব শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গকে বোঝাতে পুরুষাঙ্গ, যৌনাঙ্গ, গোপনাঙ্গসহ আরও কয়েক পদের শব্দের বাহারি ব্যবহার দেখা যায় পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে।

    কারণ হলো এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকেই মধ্যবিত্ত ভণ্ড বাঙালি অশ্লীল বলে গণ্য করে। ফলে কী নামে ‘তাহাকে ডাকিলে শ্লীল বলিয়া গণ্য হইবে’ তার কোনো কূল কিনারা খুঁজে না পেয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বেশকিছু শব্দ ব্যবহার করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। এই অঙ্গটিই যেহেতু সামাজিকভাবে অশ্লীল বলে স্বীকৃত, ফলে অঙ্গটি বোঝাতে যে শব্দই ব্যবহার করা হোক না কেন, তা সুশীলমারানী মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে অশ্লীল বলে বিবেচিত হয়। যেমন লাউয়াছড়া নামটি সুশীলমারানিদের কাছে অশ্লীল নয়। কারণ এটি একটি জায়গার নাম, জাতীয় উদ্যানের নাম। অথচ শুনতে একই রকম শোনালেও ‘ল্যাওরা’ শব্দটি তাদের কাছে অশ্লীল। কারণ এই শব্দটি দ্বারা ওই বিশেষ অঙ্গটিকে বোঝানো হয়। আর যারা শব্দটি ব্যবহার করেন তারা সুশীলমারানিদের কাছে মানসম্পন্ন মানুষ বলে বিবেচিত নয়।

    আবার ওই অঙ্গটির জন্য নতুন কোনো বিশেষ্য অন্য ভাষা থেকে আমদানি করলেও সেসব নিষ্পাপ শব্দগুলো কিছুদিনের মধ্যে বাঙালির কর্ণকুহরে অশ্লীল বলে শনাক্ত হবে। কারণ অঙ্গটাই সামাজিকভাবে অশ্লীল।

    রিপোর্টার হয়তো অনেক ভেবে চিন্তে যৌনাঙ্গ লিখে পাঠিয়েছে, সম্পাদনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা হয়তো সেটাকে গোপনাঙ্গ করে দেন। আবার রিপোর্টার যদি গোপনাঙ্গ লিখে পাঠাতেন তবে হয়তো সম্পাদক যৌনাঙ্গ করে দিতেন। কোনো শব্দ ব্যবহার করেই যেন সুখ পান না তারা। তবে অঙ্গটি ব্যবহার করে সুখ নিতে কারো আপত্তি নেই, অস্বস্তি কেবল সামাজিক পরিমন্ডলে অঙ্গটির নাম ধরে ডাকতে।

    অন্য জাতিগোষ্ঠীর মতো বাঙালিও এই অঙ্গটিকে বিরাট গুরুত্ব দিলেও বাঙালি সমাজে সামাজিকভাবে এর নেই কোনো ইজ্জত। অঙ্গটির নাম উচ্চারণ করাটাও যেন পাপ। ইজ্জত কেবল রাতের অন্ধকারে। দিনের বেলায় অচ্ছুত। পারোতো পক্ষে এর নামও নেওয়া যাবে না। নাম নিতে গেলেই অস্বস্তি।

    এ পরিপ্রেক্ষিতে হুমায়ুন আজাদের একটি প্রবচন মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সমাজ যাকে কোনো মূল্য দেয় না, প্রকাশ্যে তার অকুণ্ঠ প্রশংসা করে, আর যাকে মূল্য দেয় প্রকাশ্যে তার নিন্দা করে। শিক্ষকের কোনো মূল্য নেই, তাই তার প্রশংসায় সমাজ পঞ্চমুখ; চোর, দারোগা, কালোবাজারি সমাজে অত্যন্ত মুল্যবান, তাই প্রকাশ্যে সবাই তাদের নিন্দা করে।’

    বাঙালির কাছে এই অঙ্গটি অনেকটা পুলিশের মতো। গুরুত্ব ও ক্ষমতা থাকলেও সুশীল-সামাজিক পরিমণ্ডলে এর কোনো ইজ্জত নেই।

    এই অঙ্গটি না থাকলে মানবজাতির অস্তিত্বই থাকে না। শরীরের আর কোনো অঙ্গই এতটা গুরুত্ব বহন করে না। কানা, বা খোড়া হয়েও মানুষ তার অস্তিত্বের জানান দিতে পারে। তা ছাড়া মানুষের চোখ, কান, নাক, হাত, পা দুটি করে রয়েছে। কিন্তু এই বিশেষ অঙ্গটি একটিই।

    সুশীলগিরি মারানো এই মধ্যবিত্তদের বেশিরভাগ কর্মকাণ্ডে ভণ্ডামি পরিলক্ষিত হয়, যার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে ভাষার ব্যবহারে।

    সিনেমা দেখার সুবাদে আমার যে পর্যবেক্ষণ তাতে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীদের ক্ষেত্রে মনে হয় ভণ্ডামির মাত্রা কাছুটা কম। সেখানে যতটা ভণ্ডামি রয়েছে, সেটা নিয়ে মানুষ প্রকাশ্যে অবলীলায় কথা বলছে।

    ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচইতে জাপানি টয় নামের একটি ওয়েব সিরিজ রয়েছে। ওই সিরিজের প্রধান চরিত্র এক তরুণ চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর সেক্স টয়ের ব্যবসা শুরু করবে বলে হঠাৎ মনস্থির করে। ছেলেটির নিজের পরিবার এবং প্রেমিকা ও প্রেমিকার বাবাসহ সবাই তাতে নাখোশ। গঙ্গার ধারে প্রেমিকাকে বোঝাতে গিয়ে ক্ষোভ থেকে ছেলেটি যে সংলাপ দেয় তা হলো:

    ‘জনসংখ্যা দেড় শ কোটি

    চুদতে গেলে দাঁতকপাটি’

    যে প্রেক্ষাপটে সংলাপটি ঝাড়া হয়েছে এবং সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে তা অসাধারণ। কোনোভাবেই সংলাপটিকে অশ্লীল মনে হবে না (সুশীল নির্বোধ ব্যক্তিদের কথা ভিন্ন)। ভারতের দেড় শ কোটি মানুষ আকাশ থেকে নাজেল হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির অপরিণামদর্শী ব্যবহারের কারণেই হয়েছে। তাই যৌনতা নিয়ে সামাজিক যে ট্যাবু রয়েছে, সেটা নিয়ে স্যাটায়ার করার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সংলাপ আর কিছু হতে পারে না।

    ইজ্জত ফিরে পাক জীবনের মূল‘ধোন’

    আমাদের দেশের নাটক সিনেমায় এ জাতীয় সংলাপ ব্যবহার করলে প্রেক্ষাপট না বুঝে শিল্পবোধহীন নির্বোধ মধ্যবিত্ত বিরাট আপত্তি জানাত। সিনেমা হলে সেন্সরবোর্ড থেকে ছাড়পত্র পেত না। অথচ বক্ষ দোলানো নাচ সমৃদ্ধ নিম্নমানের যাত্রাপালার ছাড়পত্র দিয়ে আসছে আমাদের রুচিশীল সেন্সর বোর্ড। কোনটা শ্লীল আর কোনটা অশ্লীল সেটাই বুঝতে পারে না এই বাঙালি মধ্যবিত্ত সুশীল সমাজ।

    যাই হোক আর তাইহোক, মূল আলোচনা তথা গতরের মূল‘ধোন’ বিষয়ে ফেরা যাক। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গকে অশ্লীল বলে বিবেচনা করাটা মধ্যবিত্ত বাঙালির ভণ্ডামির পাশাপাশি জাতিগত অশিক্ষার পরিচয় বহন করে। এই অশিক্ষার কারণে নারীরা দীর্ঘদিন তাদের শরীর সম্পর্কেই জানতো না।

    জৈবিক বিধি মোতাবেক সব মানুষই গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গটিকে কমবেশি পূজা করে, মালিশ করে, নেড়চেড়ে দেখে, হস্তশিল্পজনিত কাঁপাকাঁপি ঘটায়, উত্থানপতনের শিহরণের সুখ নেয়, দেয়ও নানাবিধ কায়দায়, আরও কত কী (কবি হলে হয়তো সেসব অনুভূতি প্রকাশ করা যেত) ।

    এই অঙ্গটি মানুষের কাছে যতটা সমাদৃত মানবশরীরের আর কোনো অঙ্গই এতটা সমাদৃত নয়। অন্য অঙ্গগুলো কেবল সার্ভিস দিয়ে যায়, মস্তিস্কের বান্দি হিসেবে কাজ করে। তাদের নিয়ে কোনো নাড়াচাড়া হয় না, হাতাহাতি হয় না। অথচ যে অঙ্গটি মানব প্রজাতির কাছে এতটা সমাদৃত, বাঙালি সমাজে সামাজিকভাবে তার কোনো ইজ্জত নেই।

    হে সুশীলমারানি মধ্যবিত্ত, ভণ্ডামি পরিহার করে গতরের মূল‘ধোন’কে ইজ্জত দিন। ঝেড়ে ফেলুন যাবতীয় অস্বস্তি। অঙ্গটিকে সুনির্দিষ্ট নামে ডাকুন। অঙ্গটিকেই যদি অশ্লীল ভাবা হয় তাহলে ওই অঙ্গের পরিচয় বহন করা যে কোনো শব্দই অশ্লীল হয়ে যায়। আপনি আর শব্দ খুঁজে পাবেন না। খুঁজে না পেয়ে হয়তো আমদানি করবেন ইংরেজি থেকে। যেমন আমদানি করেছেন প্রেগন্যান্ট।

    সুশ্রাব্য এবং অশ্রাব্য অনুভূতি সম্পূর্ণরূপে মানসিক এবং আপেক্ষিক তো বটেই। তিন চার অক্ষরের যুক্তাক্ষর বিশিষ্ট শব্দ গোপনাঙ্গ, যৌনাঙ্গ পরিহার করে এবং এদিক-ওদিক থেকে শব্দ না হাতড়িয়ে বাংলায় কথ্য ভাষায় প্রচলিত দুই অক্ষরের ধোন, নুনু বা বাঁড়া শব্দগুলো ব্যবহার করুন। অক্ষর কম হওয়ায় এই তিনটি শব্দই পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য শিরোনামবান্ধব। কাব্যকলায় ব্যবহারেরও উপযোগী। শব্দগুলো নিতান্তই নিরীহ এবং সরল সোজা। নুনু শব্দটিকে শুনতে মিষ্টি বলেও কেউ কেউ বলে থাকেন।

    নিরীহ সব বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত সরল নামগুলো আপনার কাছে যদি অশ্রাব্য লাগে তবে সেটা আপনার এলার্জি। আর এই এলার্জি হচ্ছে আপনার নিজস্ব রোগ। সম্ভবত এই রোগ এসেছে শ্রেণী বৈষম্য থেকে। নিম্ন শ্রেণীর লোকজনের আপনার মতো পড়াশোনা নেই। তাঁদের এত শব্দ ভাণ্ডার নেই। শব্দভাণ্ডার কম বলে এই শ্রেণী আপনাদের মতো ধানাইপানাই কথা কম বলে থাকে। যৌনাঙ্গ, গোপনাঙ্গ তথা যুক্তবর্ণ বিশিষ্ট এসব জটিল শব্দ তারা ব্যবহার করে না। তাদের মুখোগহবর এসব জটিল শব্দ সাপোর্টও করে না। শিক্ষাবঞ্চিত এই শ্রেণী সরল সোজা শব্দগুলোকে ব্যবহার করে বলে আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে তা অশ্রাব্য। অথচ বাংলার এই মিষ্টি শব্দগুলো অভিধান স্বীকৃত। সুশীমারানীদের ভণ্ডামির কারণে কথ্য ভাষায় দেশি শব্দের বিলুপ্তি ঘটছে। আমদানি ঘটছে বিদেশি শব্দের। তরুণ প্রজন্মের কাউকে কাউকে আমি ডিক, কক বলতে শুনেছি। তার মানে দাঁড়ায় আপনার অঙ্গটি লজ্জায় নেতিয়ে পড়েছে। আর সেই সুযোগে আগামী প্রজন্মের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে যাচ্ছে ডিক-ককেরা। উপনিবেশিক আমলে যেমনটি করেছিল ব্রিটিশ ডিক-ককেরা।

    তাই সামাজিক ট্যাবু ও শ্রেণী বৈষম্য মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন। নিরপেক্ষ মন নিয়ে নিবিষ্ট চিত্তে শব্দগুলো নিয়ে ভাবুন। বারবার আওড়াতে থাকুন ধোন, নুনু, বাঁড়া...। দেখবেন গোপনাঙ্গ, যৌনাঙ্গ, পুরুষাঙ্গ এসব যুক্তাক্ষর বিশিষ্ট শব্দের চেয়ে এগুলো কতটা সরল, মিষ্টি ও শ্রুতিমধুর।

    সুশীলমারানিদের বৈষম্যের কারাগার থেকে মুক্তি পাক সহজ সরল মিষ্টি শব্দগুলো। লেখ্য রীতিতে মর্যাদা পাক সব শ্রেণী পেশার মানুষের শব্দ। মর্যাদা ফিরে পাক গতরের প্রধান অঙ্গ তথা জীবনের মূল‘ধোন’।

    সম্পর্কিত প্রতিবেদন

    Comments