নামে আসে যায়
নামে কী আসে যায়—এই নীতিকথা নিতান্ত নীরস নির্জন জীবনের জন্য মানানসই হতে পারে; কিন্তু রাজনীতির রঙিন রণক্ষেত্রে নামই নামতা, নামই নমুনা, নামই নম্বর। এখানে নাম মানেই ন্যায্যতা, নাম মানেই নৈপুণ্য, নাম মানেই নাগরিক নজর কাড়ার নম্বরি নকশা। কারণ রাজনীতিতে নামে আসে যায়।
রাজনীতিতে নামের যে কত দাম, তা আমের মৌসুম শুরুর আগেই ‘আম’ নিয়ে ‘আমজনতার দল’ আর ‘আ-আমজনতা পার্টি’র কামড়াকামড়ি দেখে বোঝা গেল। বোঝা গেল, ‘আম’ এখন আর শুধু ফল নয়; ‘আম’ এখন ফল্গুধারার মতো ফেটে পড়া রাজনৈতিক ফর্মুলা। ‘আমজনতার দল’ আর ‘আ-আমজনতা পার্টি’র আমলাতান্ত্রিক আমলকাণ্ড দেখে বোঝা যাচ্ছে, রাজনীতিতে ‘আম’ এখনো অমোঘ অস্ত্র।
নুরুল হকের ‘গণ অধিকার পরিষদ’ নামের দল থেকে বের হয়ে মিয়া মশিউজ্জামান আর মো. তারেক রহমান যখন রাজনীতির মাটিতে ‘আমজনতার দল’ নামক নতুন ‘আমগাছ’ রোপণ করলেন, সম্ভবত তখনই মাটির নিচে মুকুলিত হচ্ছিল আরেক ‘আ-আম’ আকাঙ্ক্ষা।
পয়সা পাচার আর ট্রি প্লান্টেশন দুর্নীতি মামলায় জেলে খেটে বের হওয়া ডেসটিনি গ্রুপের এমডি মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ‘আমজনতা’র আগে ‘আ’ জুড়ে দিয়ে ‘বাংলাদেশ আ-আমজনতা পার্টি’ খুলে ফেললেন। এই দেখে আসল আমজনতা আমতা-আমতা করতে লাগল। তাতে ‘অরিজিনাল’ আমজনতা পার্টি ডার্টি পলিটিকসের গন্ধ পেল। তারা নির্বাচন কমিশনের সালিসে নালিশ করল। তারা বলল, ‘আম’ আর ‘আ-আম’ লিখলে আলাদা দেখায়, কিন্তু বললে শোনায় একই রকম। অর্থাৎ লেখায় লঘু লিপি, উচ্চারণে একই সুর।
তাঁদের কথা হলো, ‘আম’ আর ‘আ-আম’-দুটোকেই যেহেতু একই আমবাগানের আমন্ত্রণপত্র মনে হয়, সেহেতু রফিকুল আমীনের দলকে যেন এই নামে নিবন্ধন দেওয়া না হয়। তাদের দাবি, যেহেতু তারা ‘আমজনতার দল’ নামটি সবার আগে ছালাবন্দী করেছে, সেহেতু আম এবং ছালা দুটোই তাদের।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঝড়ে যেহেতু বহু বক পড়েছে, সেহেতু কিছু ফকিরের কেরামতি কমার কথা না। অভ্যুত্থানের ঝড়ের তোড়ে আদি ও আসল ‘আম’ ওরফে ‘আওয়াম’ ওরফে ‘আওয়ামী’ বৃক্ষ উড়ে গেছে। সেই বৃক্ষের ছায়াপুষ্ট গাছপালারও ডালপালা ভেঙেছে। কিন্তু মাটির সাথে ঘাপটি মারা ঘাসপাতার কিছু হয়নি। অর্থাৎ আদি ‘আওয়ামী’ আমগাছ উপড়ে গেলেও আশপাশের আগাছা অক্ষত। এখন বর্ষার বৃষ্টিভেজা ভূমিতে তারও বুনো বীজ বেজায় বেগে বেড়ে উঠছে। আওয়ামী আমলের দেড় যুগের খরাপীড়িত রাজনীতির খটখটে মাঠে জো আসতেই রাজনৈতিক দলরূপী নতুন নতুন ঘাসপাতা ও গাছগাছড়া গজাতে শুরু করেছে।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন শর্ত সহজ করার সুপারিশ করেছিল। এরপর ইসি ‘শত ফুল ফুটতে দাও’ নীতির পথে হাঁটতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল, নতুন নতুন দল আসুক; নতুন নতুন ফুল ফুটুক। ইসির এই মনোভাব বুঝে নতুন নতুন ফুল গাছের চারা মাথা উঁচু করেছিল। তবে শুরুতেই চারাগুলোর নামের মধ্যে যে ভাব লক্ষণ দেখা গেল, তাতে মনে হলো, এসব ফুলের মধ্যে ধুতরা-আকন্দের বাড়বাড়ন্ত বেশি। আর চামেলি, গোলাপের আলাপ এক ধরনের প্রলাপের মতো মনে হচ্ছিল।
দেখা গেল, দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে পঞ্চাশটি, নিবন্ধনপ্রত্যাশী পঁয়ষট্টিটি, আবেদন বাড়ানোর আর্তি জানাচ্ছে আরও ছেচল্লিশটি। সব মিলিয়ে দেড়শো দল-দলবদ্ধ দম্ভে ‘জনতার জননী’ হওয়ার দাবিতে দাঁড়িয়ে আছে। এই দলগুলোর ৯৯ শতাংশ দলের মোটের ওপর যা আছে, তা হলো একটি নাম। নাম ছাড়া কিছুই তাদের নেই। নামসর্বস্ব এই দলগুলোর নেতা কারা, কেন তারা রাজনীতিতে আসতে চান, সে এক বিরাট প্রশ্ন।
দেখা গেল, নিবন্ধন চাওয়া একটি দলের নাম ‘বাংলাদেশ সংসারবন্দি পার্টি’। রাজনীতির সংসারে এই ধরনের ‘সঙ’-সারসম্পন্ন পলিটিক্যাল পার্টির নাম শুনে সংসারবিবাগী যে কারও ভয় পাওয়ার কথা। একইভাবে নিবন্ধন চেয়েছে ‘বাংলাদেশ শান্তির দল’, ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন’, ‘জাতীয় ভূমিহীন পার্টি’, ‘বাংলাদেশ বেকার সমাজ’, ‘বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি’।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার দাবি যখন কোনো কোনো মহল থেকে তোলা হচ্ছে, সেই সময়ে দেখা গেল, ‘আওয়ামী লিগ’ নামে নিবন্ধন চেয়ে উজ্জ্বল রায় নামের এক লোক আবেদন করে বসেছেন। তবে সে নামটি শেষ পর্যন্ত তালিকায় রাখা হয়নি। এর বাইরে বাংলাদেশ সংরক্ষণশীল দল (বিসিপি), জনতা কংগ্রেস দল, বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণময় পার্টি, বাংলাদেশ মুক্তি ঐক্যদল, বাংলাদেশ জনশক্তি পার্টি—এ ধরনের বহু বাহারি নামের দল আছে।
নিবন্ধন চাওয়া কোনো কোনো দলের নেতা সম্ভবত পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে যাত্রা পার্টির মিল পেয়েছেন। তাঁরা হয়তো ভেবেছেন, একটা পলিটিক্যাল পার্টি মানে একটা দল; একটা যাত্রা পার্টি মানেও একটা দল। দুই কিসিমের দলেই নানান কিসিমের জনবল থাকে।
যাত্রা পার্টিতে একজন অধিকারী থাকেন। তিনিই কলাকৌশল করে দল চালান। যাত্রা পার্টির কুশীলবদের অভিনয় করতে হয়। পলিটিক্যাল পার্টিতেও একজন বড় নেতা থাকেন। তাঁর নিচে মেজ-সেজ-নেতা থাকেন। তাঁদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিনয় করে পাবলিকের মন জয় করতে হয়। অ্যাকটিংয়ের পাশাপাশি পিকেটিং করতে হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, যে পার্টিতে নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, সে পার্টির সঙ্গে কি যাত্রা পার্টির তুলনা চলে?
ডেসটিনির রফিকুল সাহেব বিবিসি বাংলাকে সরল সোজা মনে বলেছেন, তিনি জেলখানায় ছিলেন। ৫ আগস্টের পর দেখলেন, জেলখানা থেকে অনেক রাজনীতিককে বিনা জামিনে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জেলারকে বললেন, ‘আমি তো বহুদিন জেলে, আমাকে ছাড়েন না কেন?’ জেলার তখন তাঁকে বললেন, ‘আপনি তো রাজনীতিক না, আপনি যদি রাজনীতিক হতেন, তাহলে ছেড়ে দিতাম। আপনি যদি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের লোক হতেন, তাহলেও ছেড়ে দিতাম।’
জেলারের এই বাণীই কি রফিকুল আমীন সাহেবকে রাজনৈতিক দল খুলতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে? রফিকুলের মতো অনেকেই জানেন, নামসর্বস্ব হোক আর কামসর্বস্ব হোক, একটি রাজনৈতিক দল মানে একইসঙ্গে একটি ঢাল ও একটি ঢোল। কে না জানে, ঢাল দিয়ে ঢিল ঠেকানো যায়, আর ঢোল দিয়ে নিজের নামে ঢ্যারা পেটানো যায়।
Comments
Post a Comment