মাল
গোলমাল থেকে ‘গোল’টা বাদ দিয়ে ‘মাল’টা যারা নিতে পারে, শেষ পর্যন্ত তারাই গোলে পৌঁছায়। এই বাণী জিনিয়াস, মানে মানী মালেরা দিয়ে গেছেন। তবে ঠিক সময়ে ঠিক মাল চেনা মালের আজকাল দারুণ আকাল। তাই চোখের সামনে থাকা মালামালের কোনটা আসল-কোনটা নকল; কোনটা তেল, কোনটা জল; তার তল পাওয়ার কোনো কল-কায়দা নাই।
কারওয়ানবাজারের কাঁচাবাজারে কক্ষ ভরা লক্ষ মাল। আবার একই মালের লক্ষ পদ। কলা, কচু, কদু, কপি, করলা, কাঁঠাল, কাবাব, কিশমিশ, খেজুর, খই, খাস্তা, গোলমরিচ, গাজর, গম, গুড়, ঘি, ঘোল, ঘুগনি, ঘৃতকুমারী, চিনি, চা, চিড়া, চিকেন, চিংড়ি, চাটনি, চকলেট, ছোলা, ছাতু, ছানা, জিরা, জাফরান, জ্যাম, জেলি, জর্দা, জয়িত্রী, ঝালমুড়ি, ঝিঙে, টমেটো, টকদই, টোস্ট, টফি, ঠোঙা, ডাল, ডিম, ডাব, ডালিম, ঢেঁড়স, ঢাকনা, তেল, তরমুজ, তুলা, তিল, তেঁতুল, তেজপাতা, থালা, দুধ, দই, দারুচিনি, ধনিয়া, ধূপ, নুডলস, নারকেল, নাশপাতি, পেঁয়াজ, পটল, পাউরুটি, পিঠা, পনির, ফুচকা, ফ্রাইড ফিশ, বাদাম, বিস্কুট, বুট, বেগুন, বরই, ভাজাভুজি, ভুট্টা, ভিনেগার, মুড়ি, ময়দা, মিষ্টি, মধু, মাছ, মাংস, যব, যষ্টিমধু, রুটি, রসগোল্লা, রসুন, লবণ, লেবু, লুচি, লাড্ডু, শসা, শর্ষে, শাক, শিম, সেমাই, সন্দেশ, সয়াবিন, সস, সিঙ্গারা—সব মাল আছে।
প্রতিটি মালের আবার একাধিক প্রতিমাল আছে। যেমন: দেশি মাল, বিদেশি মাল, লোকাল মাল, ফরেন মাল, ফ্রেশ মাল, ফ্রোজেন মাল, ভেজাল মাল, বিশুদ্ধ মাল। এইসব চৌদ্দ পদের মালের আঠারো পদের মালিক আছে। কিন্তু নিজ নিজ মালের ব্যাপারে আঠারো মালিকের আঠারো পদের দাবি নাই। সবার দাবি একটাই—‘আমার মালই আসল মাল।’
পকেটের মাল খসিয়ে চাল-ডাল কেনার পর টুকরি হাতে ঘুরতে থাকা মিন্তিকে বলবেন, ‘দে দে মাল তুলে দে...’। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকা সস্তা শ্রমিকটি ফাল দিয়ে মালের বস্তা মাথায় তুলে নেবে। মাল আপনার গাড়িতে বা বাড়িতে পৌঁছে দেবে। আপনি তার মলিন হাতে বখশিশ হিসেবে বাড়তি মাল তুলে দিলেই সে মালামাল হয়ে যাবে।
আসলে সবাই সারারাত মাল টানা বেসামাল মাতালের মতো মাল কামানোর নেশায় মেতে আছে। মালোপাড়ার আদার ব্যাপারী থেকে মালবাহী জাহাজের মালদার মালিক—সবাই মাল কামানোর তালে আছে। মাল লোড হচ্ছে গুদামে, আনলোড হচ্ছে কাস্টমসে। এই লোড-আনলোডের চক্করে যারা আছে, তাদের কারও কাছে মাল মানে মুনাফা। কারও কাছে মাল মানে মেহনতের মজুরি।
আগে বাজারের মাল মাপা হতো মণ হিসেবে; এখন হয় টন হিসেবে। কিন্তু মানুষ যখন মানুষের কাছে ‘মাল’ হয়ে ওঠে, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একসময় সিনেমায় ম্যালা চ্যালাব্যালা নিয়ে ছক্কর-বক্কর লিলেনের জামা পরা ভিলেনের আড্ডা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। ঠিক সেই সময় পাশ দিয়ে একা একা ত্যাড়াব্যাঁকা পায়ে ক্যাটওয়াকের কায়দায় নায়িকার কলেজে যাওয়ার চল ছিল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আঙুল বেঁকিয়ে নায়িকাকে দেখিয়ে ভিলেনের দেওয়া কমন ডায়ালগ ছিল: ‘কী মারাত্মক মাল রে মাইরি!’ অথবা ‘মালটাকে গাড়িতে তোল!’
এরপর নায়িকার ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ বলে সিনেমা হল গরম করে ফেলা চিৎকার-চেঁচামেচি ও দৌড়াদৌড়ি-পরবর্তী ধস্তাধস্তির সিকোয়েন্সে নায়কের উড়ন্ত এন্ট্রি হতো। ভিলেন পকেট থেকে ছুরি বা পিস্তল টাইপের মাল বের করত। নায়ক আর ভিলেন—দুই মালের মারাত্মক মারামারিতে নায়কের নিশ্চিত জয় হতো। নায়কের হিট দেখে মৎস্য মন্ত্রীর ম্যানেজারের মালয়েশিয়া-ফেরত মেয়ে মালার তখন ফিট হওয়ার দশা।
ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকা মেলোড্রামাটিক মিউজিকের মধ্যে নায়িকা মালা মোলায়েম হাতে মালা নিয়ে এগিয়ে আসত। নায়ক তখন বলত, ‘তা হয় না মালা! তোমার মতো মাল্টি মিলিয়নার মিল-মালিকের মেয়ের সাথে মালগাড়িতে মালাই বেচা এই মিলনের মিল হতে পারে না।’
‘কেন মিল হবে না?’—মালার এই প্রশ্নের জবাবে মিলন ক্লোজশটে ক্যামেরার দিকে ছল ছল চোখে চেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বক্তৃতার ভঙ্গিতে বলত, ‘কারণ, এই সমাজে মানুষকে মাপা হয় কার কাছে কত মাল, কার ঘরে কত মালপত্র, কার গুদামে কত মালামাল, তাই দিয়ে। বুঝলা মালা, মাল হলো এই সমাজে মানের মানচিত্র। মাল বেশি মানে মান-সম্মান বেশি—এই মিথ্যে মন্ত্রে মানুষ মগ্ন। মাল কম মানে মান কম—এই মর্মান্তিক মানসিকতা মানুষের মজ্জাগত।’
মিলনের মাল বিষয়ক মন্তব্য হলভর্তি দর্শকদের মনে করিয়ে দিত, যে মাল নিয়ে মানুষ মরিয়া, মুহূর্তে তা মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে। মাল মানে মায়া। মাল মানে, মেঘের মতো মিলিয়ে যাওয়া মুহূর্তের মোহ।
মাল নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগে, আসলেই তো, মাল আসলে কী? মাল কি মুক্তি, না মোহ? মানুষ মাল জমায়। কিন্তু মাল কি মুক্তি দিতে পারে? মাল কি মালিকানার মায়াজাল? মাল কি মূর্ত, নাকি মায়া? মাল কি বস্তু, নাকি বোধ? নাকি মাল মানে মানুষের মনগড়া মূল্যায়ন?
আদতে মালের মূল মূল্যায়ন মানুষের মনে। মন যখন যে মালকে মূল্যবান ধরে নিয়ে মূল্যায়ন করেছে, তখনই তা মূল্যবান হয়ে উঠেছে। মনের মর্জি মেনে মাটির মালও লালমণি হয়ে যায়, আবার মনের প্রত্যাখ্যানেই নীলমণিও মাটির মতো মলিন হয়ে পড়ে।
হীরের টুকরো কোটি টাকার মাল; তার কারণ মন তাকে মেনে নিয়েছে। মন মুখ ফিরিয়ে নিলে সেই হীরাকেই মেঝের ময়লার মতো মাড়িয়ে যেত মানুষ। তার মানে—মালের মান মাল ঠিক করে না; মনের ঠিক করা মানের ওপরই মালের মান দাঁড়ানো।
একই কায়দায় এক মানুষের মান ঠিক করে অন্য মানুষের মন। দশজন গুরুত্ব দিলে গরু টাইপের গুরুত্বহীন মালও গুরু হয়ে উঠতে পারে।
মাল নিয়ে মালার্মের মন্তব্য হলো, বস্তু মানে মালের নাম কবিতা বা সংগীতে সরাসরি না বলে ইঙ্গিতে বললেই তার মহিমা মেলে। ফুলকে সরাসরি ‘ফুল’ বললে ভুল হবে; এতে ফুল স্রেফ ‘মাল’ হয়ে ধরা দেয়। কিন্তু যখন বলা হয়,—‘সে ফুটেছে পাপড়ি মেলে দিয়ে/মাতাল করা সুবাস বুকে নিয়ে’; তখন ফুল মাল থেকে মায়া হয়ে যায়। মানে, নাম মুছে দিলে মাল মর্মে মেলে।
তবে মালের মর্মার্থ একেক জনের কাছে একেক রকম। ব্যবসায়ীর কাছে মাল মানে মুনাফা। মজুরের কাছে মাল মানে মজুরি। মালিকের কাছে মাল মানে মালিকানা। প্রেমিকের কাছে মাল মানে ‘মনের মানুষ’। মরমির কাছে মাল মানে মায়া। সিনেমার ভিলেনের কাছে মাল মানে...থাক, বাদ দেন।
মোদ্দা কথা, মাল ছাড়া মানুষ মেলে না। কারণ মানুষের জন্মই মাল থেকে। সে জৈবিক মাল থেকে মেটামরফোসিসে মানবমূর্তি ধরে এবং মুভিং ম্যাটার, মানে, চলমান মাল হয়ে বড় হতে থাকে। বড় হতে হতে মাল কামায়। মাল জমায়। মাল নিয়ে মেতে থাকে। মাল নিয়ে মারামারি করে। শেষ পর্যন্ত মাল মাটির ওপরে থাকে, মালের মালিক মাটিতে মুছে যায়।
এই সব ভাবি। মাথায় মাল উঠে বসে থাকে। মাঝে মধ্যে নামে।
(উৎসর্গ: আবুল মাল আবদুল মুহিত)
Comments
Post a Comment