বিপর্যয়কে ঘিরে ব্যবসার ধান্দা
অলংকরণ: এআই
ঘরে যখন আগুন লাগে, তখন সাধারণ মানুষেরা হাহাকার করে, পানি নিয়ে দৌড়ায় আগুন নেভাতে। কিন্তু একই সমাজে এমন একদল মানুষ থাকে, যারা আগুন নেভানোর চেয়ে বরং পুড়ে যাওয়া ঘরের জমি আর ছাই কীভাবে চড়া দামে বিক্রি করা যায়, সেই ফন্দি আঁটে। কোনো বাস দুর্ঘটনার শিকার হলে সাধারণ মানুষেরা হতাহতদের উদ্ধারে ছুটে যান। আরেক দল মানুষ হতাহতদের কাছে মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ছুটে যায়।
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পৃথিবী, আর পরাশক্তিগুলো মেতেছে নতুন সম্পদের ভাগবাঁটোয়ারায় — কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের চরম হুমকিতে থাকা সুমেরু অঞ্চলই বা কীভাবে পরিণত হলো একুশ শতকের নতুন স্নায়ুযুদ্ধ আর বাণিজ্যের রণক্ষেত্রে?
ভালোমন্দের যুগলবন্দীতেই চলছে দুনিয়া। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে কে বেশি শক্তিশালী ভালো নাকি মন্দ? এ ক্ষেত্রে হুমায়ূন আজাদ শুনিয়েছিলেন নিরাশার কথা। তার মতে, দুনিয়াতে খারাপেরাই সবচেয়ে বেশি জয়ী হয়। বিশ্বরাজনীতিতে শক্তিধর দেশগুলো বারবার তার প্রমাণ দিয়ে আসছে। তাদের এই সীমাহীন লোভের সবচেয়ে বড় শিকার এখন পৃথিবীর উত্তরের বরফাচ্ছাদিত সুমেরু অঞ্চল।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সুমেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুতগতিতে গলে যাচ্ছে, যা সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যই এক ভয়াবহ হুমকি। কিন্তু এই চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েও আমেরিকা, রাশিয়া বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলো একযোগে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বদলে নতুন বাণিজ্যপথ ও খনিজ সম্পদের লোভে মত্ত হয়েছে। পৃথিবীর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বাণিজ্যের সাম্রাজ্য গড়ার এই অমানবিক প্রতিযোগিতাকে কোনো সাধারণ শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
সুমেরু অঞ্চলের বরফ গলার গতি ও পরিণতি কতটা ভয়াবহ, তা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জিও নিউজ ও স্নোপস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুমেরুর বরফ জমাট মাটি বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার কারণে হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা প্রাচীন জীবাণুগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
সুমেরু অঞ্চলে প্রাণীদের অনেকে যারা হাজার বছর আগের কোনো অ্যানথ্রাক্স বা পুরোনো জীবাণুর কারণে মারা গিয়েছিল সেইসব জীবাণুরা বরফশীতল মাটিতে সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। উত্তর গোলার্ধের প্রায় বিশ শতাংশ এলাকাজুড়ে থাকা এই স্থায়ী বরফস্তরগুলো মূলত এক একটি ‘সময়ের খাম’ বা টাইম ক্যাপসুল হিসেবে কাজ করে, যার ভেতরে বিলুপ্ত প্রাণী এবং প্রাগৈতিহাসিক জীবাণু লুকিয়ে রয়েছে। বরফ গলে যাওয়ার কারণে এসব জীবাণুরা সুপ্ত অবস্থা থেকে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বরফ গলে যাওয়ার ফলে মৃতদেহ থেকে জেগে ওঠা জীবাণুগুলো আধুনিক বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার বিরুদ্ধে মানুষের কোনো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। ফ্রান্সের মার্সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সাইবেরিয়ার বরফ জমাট মাটি থেকে বেশ কয়েকটি প্রাচীন জীবাণু আবিষ্কার করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্যটি হলো, এই গবেষক দল ৪৮ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো একটি জীবাণুকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়েছেন। অতিপ্রাচীন এই জীবাণুটি বরফের নিচে এতদিন সুপ্ত অবস্থায় থাকার পরও তার সংক্রমণ সক্ষমতা হারায়নি।
এই প্রাচীন জীবাণুর প্রাদুর্ভাব কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নেই, তার প্রমাণ মেলে ২০১৬ সালের একটি মর্মান্তিক ঘটনায়। সুমেরু বৃত্তের ভেতরে সাইবেরিয়া অঞ্চলে বরফ গলার কারণে ছড়ানো অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর সংক্রমণে ১২ বছরের এক বালকের মৃত্যু হয় এবং আরও কয়েক ডজন মানুষ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় কয়েক হাজার বলগা হরিণও মারা যায়। অনুসন্ধান করে জানা যায়, এই মহামারির সূত্রপাত হয়েছিল পঁচাত্তর বছরেরও বেশি সময় আগে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া একটি বলগা হরিণের মৃতদেহ থেকে, যা এতদিন বরফের নিচে চাপা পড়ে ছিল।
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সুমেরুর বরফ গলতে থাকলে এই ধরনের অজানা ও প্রাণঘাতী জীবাণুগুলো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে, যা অচিরেই এক বিশাল জনস্বাস্থ্য সংকটের জন্ম দিতে পারে। পাশাপাশি সুমেরুর বরফ গলে যাওয়ার অন্যান্য প্রাকৃতিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তো রয়েছেই। এত বড় এক বিপদের সামনে দাঁড়িয়েও বিশ্বনেতাদের মনোযোগ সেদিকে নেই।
যে বরফ গলে যাওয়ার কারণে পৃথিবী আজ ধ্বংসের মুখে, সেই বরফ গলাকেই আশীর্বাদ হিসেবে দেখছে পরাশক্তিগুলো। ইউরেশিয়ান রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং ক্লিঙ্গেনডেল ইনস্টিটিউটের গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে যে, সুমেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় সেখানে জাহাজ চলাচলের এক নতুন পানিপথ খুলে যাচ্ছে, যা ‘উত্তরাঞ্চলীয় সমুদ্রপথ’ নামে পরিচিত। এই পথটি রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে ইউরোপের সাথে দূরপ্রাচ্যের বন্দরগুলোকে যুক্ত করেছে।
সুয়েজ খাল দিয়ে যেখানে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনে সাধারণত সাতাশ দিন সময় লাগে, সেখানে এই উত্তরাঞ্চলীয় সমুদ্রপথ ব্যবহার করলে মাত্র বিশ দিনেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। এই সাত দিনের সময় এবং জ্বালানি বাঁচানোর লোভে পরাশক্তিগুলো সুমেরুর পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাচ্ছে না। রাশিয়া এই সমুদ্রপথটিকে নিজেদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক করিডোর ও কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা সেখানে নিজেদের আইনি অধিকার, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে।
অন্যদিকে, চীন ভৌগোলিক দিক থেকে সুমেরু অঞ্চলের দেশ না হয়েও এই বাণিজ্যপথের অংশীদার হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। চীনের এই সম্পৃক্ততা ওই অঞ্চলে জ্বালানি রপ্তানি এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দিয়েছে।
বাণিজ্যপথের পাশাপাশি পরাশক্তিগুলোর নজর এখন সুমেরুর বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে। দি স্টেটসম্যান-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, বরফ গলার কারণে গ্রিনল্যান্ড এবং সুমেরু অঞ্চল খনিজ সম্পদ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণের এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই সম্পদের লোভ এতটাই তীব্র যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খনিজ সম্পদে ভরপুর গ্রিনল্যান্ডকে কিনে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
গ্রিনল্যান্ডের এই খনিজ সম্পদ এবং নতুন সমুদ্রপথের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র—প্রত্যেকেই মরিয়া। ক্লিঙ্গেনডেল ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই উত্তরাঞ্চলীয় সমুদ্রপথ এখন আর কেবল একটি বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ নেই; এটি রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মধ্যকার এক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো জোট গ্রিনল্যান্ড এবং উত্তর আটলান্টিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তার ওপর এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জোর দিচ্ছে।
যে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে পৃথিবী আজ ধ্বংসের মুখে, সেই একই জ্বালানি আরও বেশি করে তুলে আনার জন্য বরফ গলার অপেক্ষায় বসে আছে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো। এটি এক চরম মনস্তাত্ত্বিক বৈকল্য ও আত্মঘাতী লোভ ছাড়া আর কিছুই নয়। পরিবেশবাদীরা বারবার বলছেন, ওই অঞ্চলে তেল বা গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা করা হলে তা সুমেরুর ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু ক্ষমতার অহংকার আর টাকার ধান্দায় বুঁদ হয়ে থাকা রাষ্ট্রনেতাদের কানে সে কথা পৌঁছাচ্ছে না।
এই পুরো পরিস্থিতিটি আসলে আধুনিক পুঁজিবাদের এক নগ্ন ও বীভৎস রূপ। আমরা এমন এক বিশ্বব্যবস্থায় বাস করছি, যেখানে প্রকৃতির সংকট অনুধাবন করার মতো কোনো জায়গা নেই। বর্তমানের এই পুঁজিবাদ হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা নিজের ধ্বংসের বীজ নিজেই বপন করে এবং সেই ধ্বংসযজ্ঞকেও একটি লাভজনক পণ্য হিসেবে বাজারে বিক্রি করে।
পৃথিবীতে যখন মানুষের অস্তিত্ব হুমকির মুখে, বরফ গলে সমুদ্রের পানির স্তর বাড়ছে, উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার হুমকিতে, তখন সেই গলিত বরফের জলে নিজেদের বাণিজ্যের জাহাজ ভাসানোর স্বপ্ন দেখছে ধনী রাষ্ট্রগুলো। তারা হয়তো ভাবছে, এই সম্পদ আর ক্ষমতা দিয়ে তারা প্রাকৃতিক থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু প্রকৃতিকে ঘুষ দেওয়া যায় না। আটচল্লিশ হাজার বছরের পুরোনো সেই প্রাচীন জীবাণু যখন বরফের নিচ থেকে মুক্ত হয়ে বাতাসে মিশবে, কিংবা যখন পৃথিবীর আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে, তখন ওই নতুন বাণিজ্যপথ বা খনিজ সম্পদ কাউকেই বাঁচাতে পারবে না।
মানুষ তার মেধা দিয়ে অনেক অসাধ্য সাধন করেছে ঠিকই, কিন্তু নিজের লোভকে জয় করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সুমেরু অঞ্চলের এই বরফ গলন আর পরাশক্তির লোভ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা স্বেচ্ছায় অন্ধকারের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। বিপর্যয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ব্যবসার এই আস্ফালন যদি এখনই থামানো না যায়, তবে মানবজাতির জন্য সামনে যে ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে, তা যেকোনো কল্পকাহিনির চেয়েও ভয়ংকর হবে। এখনই সময় এই আত্মঘাতী দৌড় থেকে বেরিয়ে এসে পৃথিবীকে সারিয়ে তোলার মিছিলে যোগ দেওয়ার। কারণ, বরফ একবার পুরোপুরি গলে গেলে, ফিরে আসার আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।
লেখক: সাংবাদিক ও পিআর স্পেশালিস্ট
Comments
Post a Comment