মূল কনটেন্টে যান
ভিডিও মানে অন্যেরকল্পনা দেখা
পড়া মানে নিজেরকল্পনা গড়া
পড়ুন, কারণ টেক্সটভাবনার অবকাশ দেয়
সর্বশেষ

    নহি যন্ত্র নহি যন্ত্র

    হাত চিরকাল কাজই করে এসেছে। আর হাতকে চালিয়ে এসেছে মাথা। তাই হাত চিরকাল মাথার নিচেই থাকে। অর্থাৎ ইতিহাসের দীর্ঘ পথজুড়ে হাত সব সময়ই ছিল মাথার অধীন। কাজের ওপরে ছিল চিন্তা। শ্রমের ওপরে ছিল সিদ্ধান্ত। এ সম্পর্কই মানুষকে মানুষ করে তুলেছিল।

    কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, এই দার্শনিক সত্যের মাটি ততটাই নড়বড়ে হয়ে উঠছে। কারণ, মানবমস্তিষ্কের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব আর অক্ষুণ্ন থাকছে না। ন্যাচারাল ইন্টেলিজেন্সের পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো তাকে ছাপিয়ে, কখনো তাকে প্রতিস্থাপনের হুমকি দিয়ে হাজির হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)।

    একসময় মানুষ কাজ করত কেবল বাঁচার জন্য। শস্য ফলাত, নৌকা বাইত, হাতের হাড়ভাঙা শ্রমে–ঘামে টিকে থাকত জীবন। কাজ ছিল তার অস্তিত্ব রক্ষার সরল উপায়। কিন্তু সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে সেই কাজ বদলাতে বদলাতে হয়ে উঠল পরিচয়। ‘আমি ডাক্তার’, ‘আমি শিক্ষক’, ‘আমি কবি’—এ বাক্যগুলো শুধু পেশার বিবরণ নয়; বরং তা সমাজে মর্যাদা, অবস্থান ও স্বীকৃতির চিহ্ন হয়ে উঠল। কাজ তখন আর কেবল জীবিকা রইল না; কাজই হয়ে উঠল মানুষের আত্মপরিচয়ের আধার।

    আজ সেই পরিচয়ই প্রশ্নের মুখে। যন্ত্র যখন মানুষের চেয়ে দ্রুত, নির্ভুল ও ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করতে পারে, তখন অনিবার্যভাবে প্রশ্ন ওঠে—আমার কাজ কি এখনো আমার? আমার কাজ কি এখনো আমাকে চিহ্নিত করে, নাকি আমার পরিচয় ধীরে ধীরে যন্ত্রের দক্ষতার ছায়ায় ম্লান হয়ে যাচ্ছে?

    মানুষের ইতিহাস আসলে যন্ত্রের ইতিহাসও। আগুন, চাকা, ছাপাখানা—প্রতিটি আবিষ্কারই একসময় ভয় জাগিয়েছে, আবার একই সঙ্গে খুলে দিয়েছে মুক্তির নতুন দরজা।

    হাত চিরকাল কাজই করে এসেছে। আর হাতকে চালিয়ে এসেছে মাথা। তাই হাত চিরকাল মাথার নিচেই থাকে।

    অর্থাৎ ইতিহাসের দীর্ঘ পথজুড়ে হাত সব সময়ই ছিল মাথার অধীন। কাজের ওপরে ছিল চিন্তা। শ্রমের ওপরে ছিল সিদ্ধান্ত। এ সম্পর্কই মানুষকে মানুষ করে তুলেছিল।

    কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, এই দার্শনিক সত্যের মাটি ততটাই নড়বড়ে হয়ে উঠছে। কারণ, মানবমস্তিষ্কের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব আর অক্ষুণ্ন থাকছে না। ন্যাচারাল ইন্টেলিজেন্সের পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো তাকে ছাপিয়ে, কখনো তাকে প্রতিস্থাপনের হুমকি দিয়ে হাজির হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)।

    এআই সেই ধারারই সর্বশেষ সংযোজন। তবে এক অর্থে এটি আলাদা। কারণ, এআই শুধু মানুষের হাতের শক্তি বাড়ায় না, সে ঢুকে পড়ে মাথার ভেতর। চিন্তার কেন্দ্রে; সিদ্ধান্তের স্তরে।

    মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় দ্বিধার মধ্য দিয়ে। সে ভুল করে, অনিশ্চয়তায় ভোগে। আর সেই দ্বিধা, সেই ভুল থেকেই জন্ম নেয় অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা থেকেই শেখা। শেখা থেকেই আত্মপরিবর্তন। যদি সেই দ্বিধাটুকুও যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণই হয়ে ওঠে অ্যালগরিদমের কাজ, তবে মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার জায়গাটি কোথায় থাকবে?

    মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় দ্বিধার মধ্য দিয়ে। সে ভুল করে, অনিশ্চয়তায় ভোগে। আর সেই দ্বিধা, সেই ভুল থেকেই জন্ম নেয় অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা থেকেই শেখা। শেখা থেকেই আত্মপরিবর্তন। যদি সেই দ্বিধাটুকুও যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণই হয়ে ওঠে অ্যালগরিদমের কাজ, তবে মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার জায়গাটি কোথায় থাকবে?

    এআই ইতিমধ্যেই চিকিৎসা, শিক্ষা ও সাংবাদিকতায় বিস্ময়কর অগ্রগতি এনেছে। রোগ শনাক্তকরণে, চিকিৎসা পরিকল্পনায়, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি অনুমানে সে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে দ্রুত ও নির্ভুল। শিক্ষায় সে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার পথ তৈরি করছে, শিক্ষার্থীকে নিজের গতিতে এগোনোর সুযোগ দিচ্ছে। সাংবাদিকতায় এআই তথ্যের পাহাড়ে প্রবেশ করে ধারা ও অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করছে, সময় বাঁচিয়ে দিচ্ছে অনুসন্ধানের জন্য।

    কিন্তু এই একই এআই আবার হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর হিসাব কষছে। গাজায় মানুষের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তৈরি হয়েছে ‘কিল লিস্ট’। ফেশিয়াল রিকগনিশন, নজরদারি ক্যামেরা ও ড্রোন—সব মিলিয়ে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে অ্যালগরিদমিক।

    গাজা যুদ্ধে ‘দ্য গসপেল’ নামের একটি সিস্টেম ব্যবহৃত হয়েছে, যা দ্রুত কথিত হামাস সদস্যদের আশ্রয় নেওয়া ভবনগুলো চিহ্নিত করেছে। ‘ল্যাভেন্ডার’ নামের আরেকটি সিস্টেম লক্ষ্য হিসেবে ‘হামাস সদস্যদের’ চিহ্নিত করত। এর মাধ্যমে যেসব মানুষকে হামাস সদস্য হিসেবে সে চিহ্নিত করত, তাদের এয়ারফোর্সের বোমার লক্ষ্যবস্তু করা হতো।

    ‘ওয়েয়ার্স ড্যাডি’ নামের আরেকটি সিস্টেম একই সময়ে ল্যাভেন্ডারের চিহ্নিত করা ব্যক্তিদের ট্র্যাক করত এবং তাঁরা তাঁদের পরিবারের বাড়িতে পৌঁছালে সংকেত পাঠাত। ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেমস নামে পরিচিত এআই সিস্টেমগুলো তখনই সেই বাড়িতে বাড়িতে হামলার সিদ্ধান্ত দিত। এ সিদ্ধান্ত নিতে এআই সর্বোচ্চ ২০ সেকেন্ড সময় নিত। বোমায় বাড়িঘর উড়ে যেত। কিন্তু বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দেওয়া এআই তো জানে না, একজন হামাস সদস্য যে বাড়িতে ঢুকল, সে বাড়িতে নিরপরাধ নারী, শিশু, বৃদ্ধ রয়েছে।

    এআইনির্ভর সামরিক সিস্টেমের বিকাশের কারণে আশঙ্কা করা হয়, ভবিষ্যৎ কিলার রোবট দিয়ে দুনিয়া শাসন করা হবে। তখন এআই পরিচালিত ড্রোন বা সামরিক যান নিজেই ঠিক করবে কে বাঁচবে আর কে মরবে।

    এআই জটিল অঙ্ক দ্রুত সমাধান করা ও মুহূর্তের মধ্যে উপাত্ত বিশ্লেষণ করার মতো কেরানির কাজ যেমন করে, তেমনি সৃষ্টিশীল কাজও করে। এআই কবিতা লেখে, ছবি আঁকে, গানের কথা লেখে, সুর তোলে। তার মানে যন্ত্রও সৃষ্টি করতে পারে। প্রশ্ন হলো তাহলে এআই থেকে মানুষ আলাদা কেন?

    আসলে মানুষ সৃষ্টি করে স্মৃতি থেকে, ক্ষত থেকে, ভালোবাসা থেকে। আর যন্ত্র সৃষ্টি করে সম্ভাবনার হিসাব থেকে। সম্ভবত যন্ত্রের সঙ্গে এখানেই মানুষের পার্থক্য।

    এখন হয়তো সেই সময় এসে গেছে, যখন পরিচয় আর শুধু দক্ষতা বা নিখুঁত কাজ করার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। মানুষ হিসেবে আমরা কতটা ভাবতে পারি, অনুভব করতে পারি এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে পারি, তার ওপর আমাদের পরিচয় নির্ভর করবে।

    দেকার্ত থেকে শুরু করে কান্ট পর্যন্ত প্রায় সব আধুনিক দর্শনে মানুষ একটি বিশ্বাসকে কেন্দ্রে রেখেছিল। সেটি হলো যুক্তি। দেকার্ত বলেছিলেন, মানুষ চিন্তা করতে পারে বলেই তার অস্তিত্ব নিশ্চিত; অর্থাৎ ‘আমি চিন্তা করতে পারছি, তার মানে আমি আছি।’

    অর্থাৎ যুক্তি মানুষকে শুধু পৃথিবী বোঝার ক্ষমতাই দেয় না, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারও দেয়। কান্টও বিশ্বাস করতেন, মানুষের যুক্তিবোধ দিয়েই প্রকৃতি, নৈতিকতা ও সমাজকে নিয়মের মধ্যে আনা সম্ভব।

    এ দীর্ঘ ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে এমন এক জগৎ গড়ে তোলে, যেখানে হিসাব, নিয়ম, পরিমাপ আর বিশ্লেষণই হয়ে ওঠে সত্য বোঝার প্রধান উপায়। বিজ্ঞান, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি—সবই দাঁড়িয়ে থাকে এই যুক্তির ওপর।

    এআই সেই যুক্তিবাদেরই চূড়ান্ত রূপ। মানুষের মস্তিষ্ক যেখানে সীমিত তথ্য নিয়ে কাজ করে, সেখানে এআই অগণিত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে। সম্পর্ক খুঁজে বের করে, ধারা শনাক্ত করে, ভবিষ্যৎ অনুমান করে—সবই এমন গতিতে ও নির্ভুলতায়, যা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এই অর্থে এআই হলো যুক্তির যান্ত্রিক, অমানবিক ক্ষমতার প্রকাশ।

    কিন্তু যুক্তি দিয়ে সবকিছু বোঝা গেলেও সবকিছুর অর্থ কি কেবল তথ্য আর বিশ্লেষণ থেকেই আসে? মানুষের অনুভূতি, দ্বিধা, নৈতিক সংকট, অনিশ্চয়তা—এ জায়গাগুলো যুক্তির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এআই যুক্তির শক্তিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু সে মানুষের মতো করে অর্থের ভার বহন করে না।

    কিন্তু যুক্তি দিয়ে সবকিছু বোঝা গেলেও সবকিছুর অর্থ কি কেবল তথ্য আর বিশ্লেষণ থেকেই আসে? মানুষের অনুভূতি, দ্বিধা, নৈতিক সংকট, অনিশ্চয়তা—এ জায়গাগুলো যুক্তির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এআই যুক্তির শক্তিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু সে মানুষের মতো করে অর্থের ভার বহন করে না।

    মিশেল ফুকো দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা আধুনিক যুগে আর কেবল দণ্ড বা নিষেধের মাধ্যমে কাজ করে না; সে কাজ করে জ্ঞান ও নজরদারির মাধ্যমে। এআই সেই ক্ষমতাকে প্রায় নিখুঁত করে তোলে। অ্যালগরিদম জানে আমরা কী করি, কী ভাবি, এমনকি কী করতে পারি।

    তবু এআই আশীর্বাদও হতে পারে যদি তা মানুষকে ক্লান্তিকর শ্রম থেকে মুক্ত করে, আর তাকে অর্থপূর্ণ কাজে ফিরিয়ে আনে। এআই যখন সিদ্ধান্ত নেয়, কাকে ঋণ দেওয়া হবে, কাকে সন্দেহ করা হবে, তখন নৈতিকতা গাণিতিক নিয়মে রূপ নেয়।

    এ সরলীকরণ ও স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বড় হুমকি। কারণ, তখন কেউ দায় নেয় না। তখন দোষটা পড়ে ‘সিস্টেমের’ ওপর।

    তবে নৈর্ব্যক্তিক জায়গা দেখলে বলা যায়, এআই নিজে কোনো হুমকি নয়, কোনো আশীর্বাদও নয়। সে একধরনের নৈতিক পরীক্ষাগার। সেখানে মানুষকে প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়—কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কাকে ক্ষমতা দেবে, আর কোন সীমা অতিক্রম করবে না।

    এআই তখনই হুমকি হয়ে ওঠে, যখন মানুষ তার ওপর দায়িত্ব ছাড়ে। এআই তখনই আশীর্বাদ হয়ে ওঠে, যখন মানুষ কর্তৃত্ব ধরে রাখে।

    ২০২৬ সালের প্রথম প্রভাতে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা তাই প্রযুক্তিগত নয়, গভীরভাবে নৈতিক। মানুষ কি তার বিচারবুদ্ধি যন্ত্রের হাতে তুলে দেবে, নাকি যন্ত্রকে নিজের বিচারবুদ্ধির অধীন রাখবে? এ সিদ্ধান্ত এআই নেবে না। নিজের বুদ্ধিতে এ সিদ্ধান্ত মানুষকেই নিতে হবে।

    সম্পর্কিত প্রতিবেদন

    Comments