পরাশক্তির শুল্ক আগ্রাসন: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার আসল চ্যালেঞ্জ

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য এখন বড় দেশগুলোর ক্ষমতা দেখানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রভাবশালী দেশগুলো যখন বাণিজ্য ও করের নিয়মনীতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো পড়েছে এক নতুন ও কঠিন বিপদে। একদিকে আমাদের পণ্য বিক্রির প্রধান বাজারগুলোতে কর বা শুল্ক বাড়ানোর হুমকি, অন্যদিকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদেশ থেকে খাবার কেনার অনিশ্চয়তা -এমন বহুমুখী চাপের মুখে দেশের সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্য সরকারকে তার পুরোনো চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় নিজেদের খাদ্য নিজেরা উৎপাদন করা এবং এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের নতুন জোট গড়াই হতে পারে আমাদের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।
রেহমান সোবহানের সতর্কবার্তা
বিশ্ব বাণিজ্যের সাম্প্রতিক অবস্থা দেখলে মনে হয়, পুরোনো আমলের জমিদারি প্রথা যেন নতুন করে ফিরে আসছে। দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্প্রতি 'দ্য ডেইলি স্টার'-এর এক প্রতিবেদনে এমনই এক বিপদের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বের প্রভাবশালী বড় দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের দুনিয়াকে আবারও সেই পুরোনো যুগে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোকে ভয়ভীতি দেখাতে বা নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে কর বা শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই 'শুল্ক আগ্রাসন' কেবল সাধারণ কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এটি দুর্বল দেশগুলোকে তাদের পণ্য কিনতে এবং তাদের দেশে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করার একটি কৌশল। আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে ঘিরে বিশ্বের সব দেশের জন্য বাণিজ্যের যে একটি সাধারণ নিয়ম ছিল, তা আজ চরম সংকটে। এর বদলে জায়গা করে নিচ্ছে দুটি দেশের মধ্যকার নিজস্ব চুক্তি, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো কঠিন শর্ত চাপিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মতো দেশ, যাদের আয়ের প্রায় ৮৬ ভাগই আসে তৈরি পোশাক থেকে এবং যারা মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি এক ভয়াবহ বিপদের কারণ। বড় দেশগুলো যখন নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে শুল্ক বাড়ায় বা কমায়, তখন আমাদের মতো একমুখী অর্থনীতির দেশের ভিত যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
স্বয়ংসম্পূর্ণতার আড়ালে আমদানির ঝুঁকি: চাল-গম ও কৃষিপণ্যের বাস্তব চিত্র
দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সাথে খাদ্য নিরাপত্তা নিবিড়ভাবে জড়িত। কাগজ-কলমে আমরা চাল বা কিছু কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলি ঠিকই, কিন্তু 'দ্য ডেইলি স্টার'-এর খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ বিশ্লেষণে এক ভিন্ন ও আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২২ ভাগ পরিবার মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার খাদ্য সংকটের মুখে আছে এবং এক ভাগ পরিবার চরম অভাবের শিকার।
এই খাদ্য সংকটের কারণ শুধু দেশে উৎপাদন কম হওয়া নয়। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিদেশ থেকে খাবার কেনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের কৃষি ও প্রকৃতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি, চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি এবং ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আমরা বিদেশের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগামী এক বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৭৪ লাখ মেট্রিক টন গম বিদেশ থেকে কেনার প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু গম নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে প্রতি বছর দেশের প্রচুর টাকা দেশের বাইরে চলে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এক মাসের হিসেবেই চাল ও গম আনতে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। সারা বিশ্বে সারের সংকট, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে যেকোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের আয়ের বেশিরভাগ অংশই খাবারের পেছনে যায়, তারাই এই বিশ্বব্যাপী দাম বৃদ্ধি ও পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার সবচেয়ে বড় শিকার।
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং খাদ্য আমদানির দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা
'খাদ্য সার্বভৌমত্ব' বলতে কেবল গুদামে খাবার জমিয়ে রাখাকে বোঝায় না। এর আসল অর্থ হলো— বাইরের কোনো দেশের চাপ ছাড়া, নিজেদের ব্যবস্থায় খাদ্য উৎপাদন ও তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এই ক্ষমতা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বড় দেশগুলোর শুল্ক নীতির কারণে যদি আমাদের তৈরি পোশাক বা অন্যান্য পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জমানো তহবিলের ওপর। এই তহবিল কমলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জরুরি খাদ্য, সার ও জ্বালানি কেনার ক্ষমতাও কমে যাবে। এটি একটি চক্রাকার ফাঁদ: শুল্ক আগ্রাসনের কারণে আয় বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই সংকটের কারণে দেশের খাবার আমদানি আটকে যায়।
এই দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের কৃষিব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু বেশি ফসল ফালানোই যথেষ্ট নয়; বরং কৃষি কাজকে সবার অংশগ্রহণমূলক, নতুন প্রযুক্তিনির্ভর এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল করতে হবে। পাশাপাশি, সার ও বীজের মতো জরুরি উপকরণের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই এগুলো উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
পশ্চিমা বাজারের খবরদারি এবং একটিমাত্র বাজারের ওপর নির্ভরতার এই ফাঁদ থেকে বের হতে হলে বাংলাদেশকে বাণিজ্যের নতুন পথ খুঁজতে হবে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে আমাদের আশেপাশের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য জোট বাড়ানো। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট (আসিয়ান) এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বাণিজ্যিক পথে যুক্ত হওয়া।
বাংলাদেশ বর্তমানে আসিয়ানের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য জোরালো কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছে। আসিয়ান হলো প্রায় ৬৮ কোটি মানুষের এবং বিশাল অর্থনীতির একটি বাজার। এই জোটের সাথে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের জন্য একাধিক কৌশলগত সুবিধা তৈরি হবে:
প্রথমত, তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য পণ্য বিক্রি বাড়াতে এবং নতুন বাজার ধরতে এটি একটি দারুণ মাধ্যম হতে পারে। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর আমাদের অতি-নির্ভরশীলতা কমবে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় দেশগুলোর চলমান দ্বন্দ্বে আসিয়ান জোট নিজেদের খুব সফলভাবে নিরপেক্ষ রাখতে পেরেছে। এই জোটের সাথে যুক্ত হলে বাংলাদেশও বাইরের চাপ মোকাবিলার ক্ষেত্রে একটি বড় রক্ষাকবচ পাবে।
তৃতীয়ত, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় 'সাসেক' ও মিয়ানমার হয়ে যে আঞ্চলিক যোগাযোগ পথ তৈরি হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন হলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। এতে করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহন অনেক সহজ হবে।
একইভাবে, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য চুক্তি ও সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের একটি নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কৃষিপণ্য ও জ্বালানি কেনাবেচার ক্ষেত্রে যদি নিজস্ব মুদ্রায় (টাকা ও রুপি বা অন্যান্য স্থানীয় মুদ্রা) লেনদেন করা যায়, তবে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের চাপ অনেকাংশেই কমে যাবে।
বর্তমান যুগে একটি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং খাদ্যের অধিকার একে অপরের পরিপূরক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরাশক্তিগুলোর 'শুল্ক আগ্রাসন' একটি কঠিন বাস্তবতা, যা থেকে রাতারাতি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এই বাইরের চাপ থেকে দেশের সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্রকে দুটি দিকে একযোগে কাজ করতে হবে। একদিকে কৃষিতে নিজেদের ক্ষমতা ও নতুন প্রযুক্তি বাড়িয়ে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বলয়ের বাইরে এশিয়ার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের শক্তিশালী সেতু তৈরি করতে হবে। সঠিক নিয়মকানুন, স্বচ্ছতা এবং দূরদর্শী বাণিজ্য-কূটনীতিই পারে এই সংকটময় পৃথিবীতে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
তথ্যসূত্র:
১. রেহমান সোবহানের বক্তব্য ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্যের সংকট বিষয়ক প্রতিবেদন - দ্য ডেইলি স্টার।
২. বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও আমদানিনির্ভরতা বিষয়ক 'বিগ পিকচার' বিশ্লেষণ - দ্য ডেইলি স্টার।
৩. খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিষয়ক দেশব্যাপী জরিপের তথ্য - বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।
৪. বাংলাদেশে খাদ্যশস্য আমদানির প্রাক্কলন ও পরিসংখ্যান - যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ।
৫. খাদ্যপণ্য আমদানি ব্যয়ের হিসাব - বাংলাদেশ ব্যাংক।
৬. এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আসিয়ান জোটের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ বিষয়ক সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনসমূহ।
Comments
Post a Comment