‘গুরুবাদ’: কাটা না পড়ুক কোনো একলব্য’র বৃদ্ধাঙ্গুলি
একজন মানুষের শিক্ষণে গুটি কয়েক লোক জড়িত থাকেন না। শিক্ষণ হলো উন্মুক্ত-বহুমুখী প্রক্রিয়া; আলোকিত মানুষ হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর শেষ বলে কিছু নেই। এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি অগুনতি লোক জড়িত থাকেন বা জড়িত হন। আর চিন্তা লিপিবদ্ধ থাকায় অতীত ও বর্তমানের সীমাহীন লোক একজন মানুষের শিক্ষণে যুক্ত হতে পারেন। অন্য প্রাণী এবং জাগতিক সব বস্তুও মানুষের শিক্ষণ প্রক্রিয়ার অনুষঙ্গ।
অন্ধ গুরুভক্তি আমাদের শিক্ষার্থীদের মগজের অসীম সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে তাদের মেরুদণ্ডহীন এক অনুগত খাদ্যে পরিণত করছে — এই ক্ষতিকর গুরুবাদী শৃঙ্খল ভেঙে আমাদের সমাজ কি কখনো মুক্তচিন্তার স্বাধীন মানুষ গড়তে পারবে?
সুনির্দিষ্ট সীমা না থাকায় এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার মাধ্যমে এবং মেধার ভিত্তিতে একজন মানুষ সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। সব মানুষেরই এই অসীম ক্ষমতা রয়েছে। এই অসীম ক্ষমতার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে দেয় আমাদের সমাজের গুরুবাদী মানসিকতা। এই মানসিকতার কারণে শিক্ষণ প্রক্রিয়াটা হয় একমুখী; অগ্রজ থেকে অনুজে। অনুজ থেকে অগ্রজে নয়।
আমাদের সমাজে একটা শিশু জন্মের পর থেকে বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্তে তার শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিরা গুরু সেজে বসেন। শুধুমাত্র বয়সের যোগ্যতায় গুরু বনে যান গুরুজনেরা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেবলমাত্র জ্যেষ্ঠতার যোগ্যতায় এবং গুরু-শিষ্যের তৈলাক্ত সম্পর্ক থেকে সৃষ্ট স্বজনপ্রীতির যোগ্যতায় বনে যাওয়া বসরাও সহকর্মী থেকে গুরু বনে যান। আর গুরু মানসিকতা পোষণ করে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করেন শিক্ষকেরা। কারণ শিক্ষকেরা শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত থাকেন। তাই তাঁদের গুরু মানসিকতার প্রভাবটাও ভয়াবহ। গুরু-শিষ্যের ‘মধুর সম্পর্ক’ আমাদের সংস্কৃতির অংশ। জন্মের পর থেকেই একটি শিশু এই সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। বেশির ভাগ বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক হয় আদর এবং শাসনের। বন্ধুত্ব থাকে যৎসামান্য। যা শিশুকাল থেকেই সন্তানের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
গুরু-শিষ্য সম্পর্কে দুটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবচন রয়েছে হুমায়ুন আজাদের। একটি হলো, ‘ভক্ত শব্দের অর্থ খাদ্য। প্রতিটি ভক্ত তার গুরুর খাদ্য। তাই ভক্তরা দিনদিন জীর্ণ থেকে জীর্ণতর হয়ে আবর্জনায় পরিণত হয়।’
শিষ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ তার মগজের অসীম ক্ষমতার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তাই শিক্ষণেরও সমাপ্তি ঘটে। শিষ্য গুরুর খাদ্যে পরিণত হয়; নিজস্ব চিন্তাশক্তি হারিয়ে তারা আবর্জনায় পরিণত হয়।
আমাদের সমাজের অগ্রজ প্রজন্ম অনুজ প্রজন্মকে ভক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে চান। ভক্ত না হলে অনুজকে ‘বেয়াদব’ বলে সম্বোধন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন দেখেছি, দুই-একজন ছাড়া সেখানকার বেশির ভাগ শিক্ষক গুরুবাদী মানসিকতার গুরুতর সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। একইভাবে দুই-একজন ছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থী শিষ্য মানসিকতা থেকে বের হতে পারেননি। আর ওই ‘দুই-একজন’ ছাত্র গুরুবাদী শিক্ষকদের দৃষ্টিতে হয়ে যান ‘বেয়াদব’। ছাত্রের কোনো প্রশ্নে আটকে গেলে তাঁরা ছাত্রটির প্রতি বিরক্ত হন। ক্ষেত্রবিশেষে গুরুভক্তি না করার ‘অপরাধে’ পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়াসহ নানাভাবে সাজাও দেন। আমাদের সমাজের শিক্ষাবঞ্চিত একজন বয়স্ক মানুষ গুরুবাদী মানসিকতা থেকে তরুণ দেখলে সালাম (সম্মান অর্থে) দেন না; বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষকও ওই বোধ থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তাঁরা ছাত্রকে শিষ্য বাদে অন্য কিছু ভাবতে পারেন না। অথচ কোনো ছাত্র যদি তাঁর শিক্ষককে ছাড়িয়ে যান, তবেই ওই শিক্ষকের সার্থকতা ফুটে ওঠে। কিন্তু শিক্ষকেরা সেটি ভাবেন না। তাঁরা ভেবে দেখেন না যে, আইনস্টাইনও কারও না কারও ছাত্র ছিলেন।
আমাদের বিজ্ঞানের শিক্ষকেরা যেভাবে আইনস্টাইনকে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করেন, তাতে মনে হয় আইনস্টাইন পদার্থ বিজ্ঞানের গুরুতো বটেই, মহামানব। আর গুরুবাদী মানসিকতা থেকে আইনস্টাইনকে মহামানব বানানোর কারণে মগজের অসীম ক্ষমতার প্রতি আস্থা নষ্ট হয়ে যায় বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের। সাধারণ মানুষ কি আর মহামানব হতে পারে? আমাদের দেশের বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা তাই চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের মগজে ভক্ত মানসিকতার বীজ বপন করে দেন। তাই বা দেবেন না কেন? শিক্ষকদের মগজও এককালে ঢোকানো ওই বীজ দীর্ঘদিনে পূর্ণাঙ্গ গাছ হয়ে বিপুল পরিমাণ ফল ও বীজে পরিপূর্ণ। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই ভক্ত বানিয়ে শিক্ষার্থীদের মেরুদণ্ড- ভেঙে দেওয়া হয়।
আইনস্টাইন বিরাট বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানের গুরু নন। অন্য বিজ্ঞানীর কাজ হচ্ছে, আইনস্টাইনের তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করা, অথবা তাঁর তত্ত্বের ভিত্তিতে নতুন তত্ত্ব প্রণয়ন করা। বিজ্ঞানীরা আইনস্টাইনকে গুরু মানলে বিজ্ঞান আইনস্টাইনেই থেমে যাবে।
শুধু বিজ্ঞানের তত্ত্ব নয়, শিক্ষার অন্য সব শাখায়ও একই কথা প্রযোজ্য। গুরুবাদী মানসিকতার কারণে তত্ত্ব হয়ে যায় গুরুতত্ত্ব। অধস্তন শিষ্যরা চিন্তাই করতে পারেন না যে, তত্ত্ব ভেঙে নতুন তত্ত্ব গড়া সম্ভব। তত্ত্ব মুখস্থ করাই ভক্তের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। গুরু-শিষ্যের এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ভালো ফল করাটা নির্ভর করে মুখস্থ করা তত্ত্ব দাঁড়ি-কমাসহ পরীক্ষার খাতায় ঝেড়ে দেওয়ার ওপর। আর তত্ত্বের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে তাত্ত্বিক গুরুর জন্ম ও মৃত্যু সাল। পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে মেধার পরিবর্তে মূলত তথ্য মুখস্থ রাখার ক্ষমতা যাচাই করা হয়। এসব স্থূল প্রশ্নপত্র নাকি তৈরি করে থাকেন দেশের নামীদামি অধ্যাপকেরা।
ভয়াবহ এই রীতির কারণে মুখস্থ করতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যতিক্রম দুই-একজনেরা পায় না মেধার স্বীকৃতি। আর গুরু-দক্ষিণা দিয়ে ওই স্বীকৃতি পেয়ে যান অযোগ্যরা। এভাবে প্রতিনিয়ত গুরুবাদী সমাজ চাপা দেয় মেধাকে।
গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের মধ্যে উত্তম-অধম বা উঁচু-নিচু তথা শ্রেণি বিভাজন রয়েছে। গুরুবাদী মানসিকতা এসেছে পশ্চাৎপদ সামন্ত মানসিকতা থেকে। এই শ্রেণি বিভাজন মানুষের শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে একমুখী করে তোলে। ফলে অধস্তনের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়; বাধাগ্রস্ত হয় সমাজের পরিবর্তন তথা প্রগতিশীলতা। কারণ গুরু-শিষ্যের চক্রেই ঘুরপাক খায় সমাজ।
আমাদের সমাজ শেখায়, গুরুজনকে গুরুভক্তি করতে, শ্রদ্ধা করতে। গুরুজন কোনো অপরাধ করলে তার সাফাই গেয়ে বলা হয়, ‘হাজার হলেও গুরুজন’। তখন গুরুজন হয়ে একই সুবিধা নেওয়ার চিন্তা করে শিষ্যটি। শিক্ষক এবং গুরুজনদের জন্য আমাদের সমাজ সম্মান অবধারিত করে রেখেছে। অথচ সম্মান কারও অবধারিত সম্পত্তি নয়। পদাধিকার বলে বা জ্যেষ্ঠতার খাতিরে নয়, সম্মান নির্ভর করে ব্যক্তির কাজের ওপর। একজন ভালো শিক্ষক প্রজন্মকে যেমন গড়তে পারেন, তেমন একজন খারাপ শিক্ষক প্রজন্মের ওপর ভয়াবহ খারাপ প্রভাব ফেলেন। কোনো বিষয়ের (পাঠ্য) অযোগ্য শিক্ষক ওই বিষয়টি থেকে আজীবনের জন্য ছাত্রকে দূরে ঠেলে দিতে পারেন। শিক্ষক মানেই নির্বিচারে শ্রদ্ধার পাত্র নন। অগ্রজ-অনুজে, শিক্ষক-ছাত্রে এবং বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক হতে হবে বন্ধুত্ব-সুলভ। এর মধ্যে অবধারিত বা আরোপিত ভক্তি-শ্রদ্ধা বাঞ্ছনীয় নয়।
শিক্ষক দেখলে ‘সার স্লামালাকুম’ বলে ছাত্রের গুটিসুটি মেরে যাওয়ার মতো হাস্যকর ঘটনা প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। অবধারিত এই ভক্তি-শ্রদ্ধা শিক্ষক-ছাত্রের স্বাভাবিক সম্পর্ককে নষ্ট করে। এই শ্রদ্ধা সত্যিকার অর্থে কোনো শিক্ষিত লোক উপভোগ করতে পারেন না। শ্রদ্ধা স্বতস্ফুর্ত মনের ব্যাপার। এর সঙ্গে বয়সেরও কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো অনুজের ব্যক্তিত্বকেও সম্মান করতে পারেন অগ্রজ কেউ।
আমাদের সমাজের কবি-সাহিত্যিকেরাও গুরুবাদী মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারেননি। যে কারণে আমাদের সমাজে কবি হয়ে যান কবিগুরু। গুরুর আধিপত্যে চাপা পড়ে নতুন প্রতিভা। জীবনানন্দ দাশ তাঁর জীবদ্দশাতে জীবনানন্দ দাশ হতে পারেননি। বুদ্ধদেব বসু যদি গুরু মানসিকতা পোষণ করতেন তবে জীবনানন্দ দাশ আদৌ জীবনানন্দ দাশ হতেন কিনা-তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আমাদের এই গুরুবাদী সমাজে হয়তো প্রতিনিয়ত মৃত্যু ঘটছে বহু জীবনানন্দের।
গুরু মানসিকতা থেকেই ‘ইঁচড়ে পাকা’ শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয় অনুজের ওপর। অথচ ইঁচড়ে পাকা বলতে যা বোঝানো হয়, তা মোটেই নেতিবাচক নয়, বরং ইতিবাচক। গুরুবাদী মানসিকতার কারণে অগ্রজেরা চান না অনুজেরা চিন্তাভাবনায় তাঁদের স্তরে আসুক; ছাড়িয়ে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। ছাড়িয়ে গেলে ইঁচড়ে পাকা শব্দটির স্থলাভিষিক্ত হয় ‘বেয়াদব’।
আলোকিত-মুক্ত মানুষ গড়ে তুলতে হলে শিশুকাল থেকেই প্রতিটি মানুষকে জানাতে হবে তার অসীম সম্ভাবনার কথা। এ জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায় পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে। গুরুবাদী মানসিকতার ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকার উত্তম উপায় হলো অপ্রাতিষ্ঠানিক বই।
মনে আছে, কৈশোরে আমার স্কুলের এক শিক্ষক ক্লাসের সবাইকে সিলেবাসের বাইরে অন্য কোনো বই পড়তে নিরুৎসাহিত করতেন। তিনি স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পুরস্কার হিসেবে অপ্রাতিষ্ঠানিক বই দেওয়ার রীতি বাতিল করে কাপ-পিরিচ জাতীয় তৈজসপত্র দেওয়ার রীতি চালু করেন। ওই শিক্ষক এখনো সেই স্কুলটিতেই শিক্ষকতা করছেন। জেনেছি, তাঁর পদ ও মর্যাদা দুটোই বেড়েছে।
অগ্রজের অন্ধ অনুসরণ নয়, অগ্রজ প্রজন্মকে ছাড়িয়ে যাওয়াটাই প্রগতি। গুরু-শিষ্যের চক্রে ঘুরপাক খাওয়া আমাদের গুরুবাদী সমাজের দ্রুত পরিবর্তন দরকার। এর জন্য প্রয়োজন গুরুমারা ব্যতিক্রম বা ‘বেয়াদব’ প্রজন্ম। অনুজ প্রজন্মের জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগেই অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
আমাদের গুরুবাদী সমাজ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘আর পঞ্চাশ বছর পর আমাকেও ওরা দেবতা বানাবে; আর আমার বিরুদ্ধে কোনো নতুন প্রতিভা কথা বললে ওরা তাকে ফাঁসিতে ঝুলোবে।’ ব্লগ-ফেসবুকে আজাদ-প্রভাবিত তরুণদের কর্মকাণ্ড-দেখে আশঙ্কা বোধ করি। তবে স্বপ্ন দেখি, পঞ্চাশ বছর পর হুমায়ুন আজাদের এই প্রবচনটি ভুল প্রমাণিত হবে। সমাজ থেকে গুরুবাদী মানসিকতা দূর হবে। তখন কেউ কাউকে দেবতা বানাবে না। প্রতিটি মানুষই হবে মুক্ত, আলোকিত মানুষ; অসীম সম্ভাবনাময় মানুষ। গুরুবাদের কারণে কাটা পড়বে না কোনো একলব্য’র বৃদ্ধাঙ্গুলি (মেধা)।
কৌশিক আহমেদ — সাংবাদিক ও পিআর স্পেশালিস্ট
Comments
Post a Comment