মূল কনটেন্টে যান
ভিডিও মানে অন্যেরকল্পনা দেখা
পড়া মানে নিজেরকল্পনা গড়া
পড়ুন, কারণ টেক্সটভাবনার অবকাশ দেয়
সর্বশেষ

    আদার ব্যাপার

    আদার ব্যাপার — ইলাস্ট্রেশন

    আমরা সয়াবিন তেলের চড়া দামের কড়া খেল দেখেছি। পেঁয়াজের আজেবাজে ঝাঁজে কপালের মাঝে কাস্টমারের চিন্তার ভাঁজ দেখেছি। কাঁচা মরিচের নাচানাচি, লাল লবঙ্গের লাফালাফি, চিকন চালের চালাকি, ডবল ডিমের ডলাডলি—সব দেখেছি। নিমকহারাম সিন্ডিকেটের কারণে নুনের বাজারেও চুনের মতো গাল পোড়ানো দাম দেখেছি। রমজান মাসে বেগুনের ওপর দিয়ে ‘গুন গুন গুন গান গাহিয়া নীল ভোমরা’ উড়তে দেখেছি।

    মাথায় ঝিমধরানো দামের দিক থেকে ডিম আগে না মুরগি আগে, সেই তর্কে জড়িয়ে কারওয়ান বাজারের চিকেন মার্কেটে দোকানদার-কাস্টমারের ঠেলাঠেলি, ধরাধরি, মারামারির তুমুল তামাশা দেখেছি।

    আমরা এমন এক বাজারসভ্যতায় বাস করি, যেখানে সবকিছুর দাম আছে, কিন্তু দামের কোনো বিবেক নেই। পণ্যের ওজন মাপার দাঁড়িপাল্লা আছে, কিন্তু মুনাফার ওজন মাপার কোনো যন্ত্র এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। বাজারে নিত্যনতুন দ্রব্যের নিত্যনতুন দাম ঝোলে, কিন্তু জনতার ন্যায্যতার জিজ্ঞাসা কোথাও ঝোলে না।

    আমরা বাজারে যাই খাবার কিনতে, ফিরে আসি দর্শন নিয়ে। আলু কিনতে গিয়ে বুঝি জীবন অস্থায়ী, পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে বুঝি চোখের পানি অনিবার্য, আর তেল কিনতে গিয়ে বুঝি সভ্যতার প্রকৃত ভিত্তি হলো পকেট।

    পৃথিবীর সব বড় দর্শনের সঙ্গে এই বাজারদর্শনের একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। সক্রেটিস সত্য খুঁজতেন, মার্ক্স পরিবর্তন খুঁজতেন, আর আমাদের পাইকার খোঁজেন মুনাফা।

    এখন চলছে আদার ব্যাপার। ব্যাপারটা এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আদা কিনতে গেলে আগে দাম শুনে আদর করে বুক চাপড়াতে হয়। আদার জীবনের মূল দর্শন ছিল পেটের সঙ্গে দেখা হওয়া। সে এখন এসে পকেটের সঙ্গে লড়াই করছে।

    রান্নাঘরের এই ছোটখাটো মূল মসলার মূলত মানুষের শরীরের সর্দি-কাশির সঙ্গে লড়ার কথা ছিল; কিন্তু আমাদের বাজারে এসে সে মধ্যবিত্তের মনোবল এবং মাসিক বাজেটের সঙ্গে লড়াই শুরু করেছে।

    একসময় কেউ বেশি নাক গলালে বলা হতো, ‘আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর কী?’ এখন আদার ব্যাপারীরা সত্যি সত্যিই জাহাজের খবর নিচ্ছেন। জাহাজের খবর নিতে নিতে জাহাজের গল্প, জাহাজের জট, জাহাজের জ্বালা, জাহাজের জটিলতা—সবই বাজারের মহাকাব্য হয়ে উঠছে। কিন্তু জাহাজ ভিড়ছে না। জাহাজের গতি কমেছে, জাহাজে মাল কমেছে, সমুদ্রে ঝড় হয়েছে, চীনে ফলন কমেছে—প্রতিটি কারণ একেকটি সিঁড়ি এবং তার ওপর পা রেখে আদার দাম ওপরের দিকে উঠছে।

    শুধু নিচের দিকে নামার কোনো সিঁড়ি নেই। অর্থনীতির এই বিশেষ মাধ্যাকর্ষণ সূত্র বাংলাদেশে বেশ কার্যকর: বাজারে কোনো জিনিসের দাম একবার ওপরে উঠলে নিউটনের আপেলও তাকে আর নিচে নামাতে পারে না।

    খুচরা ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, তাঁদের সাদা মনে কাদা নেই। তাঁরা আদা বিক্রি করেন, আদর্শ বিক্রি করেন না; দাম নেন, দায় নেন না। সব নাকি আদার গডফাদারদের দাদাগিরির কারণে হচ্ছে।

    খুচরা বিক্রেতার দুঃখও কম নয়। তাঁকে ধরলে তিনি আড়তদারকে দেখান, আড়তদারকে ধরলে তিনি আমদানিকারককে দেখান, আমদানিকারককে ধরলে তিনি আন্তর্জাতিক বাজারকে দেখান, আন্তর্জাতিক বাজারকে ধরতে গেলে দেখা যায় জাহাজ দেরি করেছে, জাহাজকে জিজ্ঞেস করলে সমুদ্রের দোষ, সমুদ্রকে ধরলে জলবায়ুর দোষ, জলবায়ুকে জিজ্ঞেস করলে সে নিশ্চুপ থাকে।

    পৃথিবীতে যত পণ্য আছে, তার চেয়ে বেশি আছে দায় ঠেলে দেওয়ার কৌশল। অর্থনীতির একটি বড় সত্য হলো, মুনাফা ওপর থেকে নিচে নামে না, আবার দায়ও নিচ থেকে ওপরে ওঠে না।

    আদার দাম বাড়লে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত; অথচ দামের টাকা কোথায় যাচ্ছে, সেই প্রশ্নে ব্যাপারি বেজার হচ্ছে।

    বাজারে এমন এক দার্শনিক রহস্য আছে, যেখানে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু জিনিসের দাম বাড়তেই থাকে; সবাই নিরুপায়, কিন্তু কারও আয় কমে না; সবাই কাঁদে, কিন্তু পাবলিক ছাড়া কারও চোখের পানি দেখা যায় না।

    পাবলিক যেহেতু গাধা, সেহেতু বিনা বাধায় পেয়াদার খাজনা আদায়ের কায়দায় আদার দাম কেজিপ্রতি তিন শ থেকে পাঁচ শ টাকা আদায় করা হচ্ছে। পাবলিককে গাধা বলা অবশ্য গাধার জন্য অপমানজনক। কারণ গাধা অন্তত বোঝা টানার বিনিময়ে ঘাস পায়; পাবলিক বোঝা টানার বিনিময়ে পায় উপদেশ। বলা হয়, ধৈর্য ধরুন। বাজারের অস্থিরতা সাময়িক। কিছুদিনের মধ্যেই স্বস্তি ফিরবে। পাবলিক বহু বছর ধরে সেই স্বস্তির জন্য অপেক্ষা করছে।

    স্বস্তি এমন এক প্রতিশ্রুতিশীল চরিত্র, যার নাম আমরা প্রায় প্রতিটি সংবাদ সম্মেলনে শুনি, কিন্তু যার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয় এখনো হয়নি। সে যেন কোনো অদৃশ্য দেবদূত—মন্ত্রী তাঁকে দেখেন, আমলা তাঁকে দেখেন, বাজার নিয়ন্ত্রক তাঁকে আসতে দেখেন, শুধু বাজারে গিয়ে পাবলিক তাঁকে দেখে না। পাবলিকের গাধাগিরির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, সে সব জানে কিন্তু কিছুই করতে পারে না।

    সকালে খবর পড়ে জানে আমদানি খরচ কত, দুপুরে বাজারে গিয়ে দেখে বিক্রয়মূল্য কত, সন্ধ্যায় টেলিভিশনে বসে বিশেষজ্ঞের মুখে শোনে সিন্ডিকেট আছে কি নেই, আর রাতে বাজারের ব্যাগ খুলে দেখে পকেটের অবস্থা কী। তারপর পরদিন আবার সেই বাজারে যায়। কারণ পেট একটি অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক অঙ্গ। সে জনসভা বোঝে না, জবাবদিহি বোঝে না, প্রতিবাদ বোঝে না, দার্শনিকতা বোঝে না। সময় হলে সে শুধু বলে, খাবার দাও। ক্ষুধা হলো এমন এক বিরোধী দল, যাকে ক্ষমতায় গিয়ে কেউ নিষিদ্ধ করতে পারেনি।

    কেউ কিছু দেখছে না। কেউ কিছু বলছে না। ‘যেন অন্ধ, চোখ বন্ধ, যেন খঞ্জ, হাত বান্ধা’। অথচ আমদানির খরচ এর অর্ধেকও নয়। এই অন্যায়ে ব্যবসায়ী ও নজরদারি কর্তৃপক্ষের সায় থাকলেও কেউ দায় নিতে চায় না বলে পাবলিক বাড়তি ব্যয়বিষয়ক ন্যায়বিচার পায় না। বাজার দেখাশোনার রেগুলেটরি বডি আর ডেডবডির মধ্যে তেমন একটা তফাত দেখা যায় না। ডেডবডির কাজ অন্তত পরিষ্কার—সে কিছু করবে না। কিন্তু রেগুলেটরি বডির কাজ এত জটিল যে, অনেক সময় সে কিছু না করাকেই কাজ বলে মনে করে। বাজারে আগুন লাগলে তারা প্রথমে খবর নেয় আগুন সত্যি কি না, তারপর দেখে আগুনের ছবি ভাইরাল হয়েছে কি না, তারপর জিজ্ঞেস করে কারও অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তারপর একটা সভা ডাকে।

    সভায় বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। উদ্বেগ প্রকাশের পর উদ্বেগের বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়। নথিভুক্তির পর নথিটি নড়াচড়া করে। বাজারের আগুনের সঙ্গে নথির গতির তুলনা করলে বোঝা যায়, আগুন ঘোড়ায় চড়ে ছুটছে আর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গরুর গাড়িতে যাচ্ছে।

    মাঝেমধ্যে অবশ্য কর্তৃপক্ষ অভিযান চালায়। অভিযান বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থার এক বিশেষ নাট্যরীতি। ক্যামেরা আগে যায়, ক্যামেরার পেছনে কর্মকর্তা, কর্মকর্তার পেছনে সহযোগী, সহযোগীর পেছনে আরও কয়েকজন। দোকানে গিয়ে কিছু কাগজ দেখা হয়, দু-চারটা পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করা হয়, ব্যবসায়ীকে কঠোর কণ্ঠে বলা হয়, ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।’ এই বাক্যটি উচ্চারণ করার পর আইন কিছুক্ষণ ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ক্যামেরা চলে গেলে আইনও কোথায় যেন চলে যায়। কোনো কোনো দোকানদারকে জরিমানা করা হয়। বড় বড় কারবারিরা তখন দূর থেকে দৃশ্যটি দেখেন। তাঁদের মুখে হয়তো এক ধরনের পিতৃসুলভ হাসি ফুটে ওঠে। কারণ বাজারের কুমির ধরতে গিয়ে মাঝেমধ্যে মাছের পোনা ধরা হচ্ছে। পাবলিক খুশি হয়—অভিযান হয়েছে। বাজার খুশি হয়—বড়দের কিছু হয়নি। সংবাদমাধ্যম খুশি হয়—সংবাদ হয়েছে। শুধু আদা আবার দাম বাড়ায়।

    বাজারে যে সাদা আদা পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই আসে চীন থেকে। কিন্তু এ বছর সেই মেইন সরবরাহকারীর সাপ্লাই চেইন ছিঁড়ে গেছে। চীনে এ বছর আদার ফলন ভালো হয়নি। ফলে চীনে ফলন কম, বাংলাদেশে জ্বলন বেশি। পৃথিবী এমনিতেই পরস্পর নির্ভরশীল। চীনের মাটিতে একটি মূল কম ফললে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের মনের মূলেও টান পড়ে। বিশ্বায়নের এর চেয়ে সুন্দর উদাহরণ আর কী হতে পারে? এক দেশের কৃষকের ক্ষেতের কাদা আরেক দেশের নাগরিকের কপালের ভাঁজে এসে লাগে।

    আগে আমরা ভাবতাম, চীন দূরে। এখন বুঝি, চীন দূরে নয়; চীনের আদার দামই সবচেয়ে কাছের। চীনের সরকার নিজেরাই বিদেশ থেকে কিনে আনছে আদা। আমাদের বাজারে এখন যে আদা পাওয়া যাচ্ছে, তার ৮০ ভাগই মিয়ানমারের। বাকি ২০ ভাগ ভারত, ইন্দোনেশিয়া আর ভিয়েতনামের দাদারা দিচ্ছেন। অর্থাৎ আদা আসছে চার দিক থেকে, কিন্তু আদার দাদাগিরি হচ্ছে আমাদের বাজারে।

    মিয়ানমারের আদা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে এমন দামি হয়ে যায় যে, মনে হয় পথে পথে তাকে সোনার সিরাপ খাওয়ানো হয়েছে। ভারত থেকে আসতে আসতে তার গায়ে বোধ হয় আমদানি-আবেগ, পরিবহন-প্রীতি, গুদাম-গুরুত্ব, আড়ত-আসক্তি এবং মুনাফার মায়া এমনভাবে জমে যে, খুচরা বাজারে এসে সে আর আদা থাকে না, আধা ভরি সোনার আত্মীয় হয়ে যায়।

    পত্রিকার খবর মারফত সরকারি নথিপত্র বলছে, পাশের দেশ থেকে আনা আদার খরচ পড়ছে সব মিলিয়ে কেজিপ্রতি ৫৮ টাকা। আর পাবলিকের পকেটের টাকা ফাঁকা করে খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকায়। এই হিসাবটি দেখে একজন সাধারণ মানুষ হয়তো ভাবতে পারেন, মাঝখানের ২২২ টাকা কোথায় গেল? প্রশ্নটি শুনতে সাধারণ হলেও উত্তরটি অত্যন্ত দার্শনিক। টাকা কখনো হারায় না, রূপান্তরিত হয়। আইনস্টাইনের ভর-শক্তির নীতির মতো বাজারেও মুনাফার একটি নীতি আছে—পাবলিকের পকেট থেকে টাকা অদৃশ্য হয় না, শুধু অন্য কোনো পকেটে স্থানান্তরিত হয়। সমস্যা হলো, পদার্থবিজ্ঞানে শক্তির সংরক্ষণ নীতি আছে, বাজারে লাভের সংরক্ষণ নীতি আছে, কিন্তু জনস্বার্থের সংরক্ষণ নীতি নেই। ৫৮ টাকার আদা ২৮০ টাকা হতে হতে কত হাত বদলায়, কত ঘাটে ওঠে, কত গুদামে ঘুমায়, কত আড়তে আড্ডা দেয়—এই সম্পূর্ণ জীবনচক্র নিয়ে একটি মহাকাব্য লেখা যায়।

    আদার জন্ম মাটিতে, কৈশোর সীমান্তে, যৌবন গুদামে, প্রৌঢ়ত্ব আড়তে, আর বার্ধক্য খুচরা বাজারে। এই দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি স্তরে কেউ না কেউ তার ওপর নিজের দার্শনিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন—আমি না খেলে কে খাবে?

    বাজারে এখন চীনের যে আদা প্রতি কেজি ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তা মূলত ১৮৭ টাকায় আমদানি করা। তার মানে, আমদানি মূল্যের আড়াই গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চীনের আদাও। চীনের মানুষ যদি জানতে পারে, বাংলাদেশের বাজারে তাদের আদা এত দামে বিক্রি হচ্ছে, তারা হয়তো নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার জন্য লজ্জিত হবে। এত দিন তারা ভেবেছে, কম দামে পণ্য উৎপাদন করা দক্ষতার পরিচয়। এখন তারা আমাদের কাছ থেকে শিখতে পারে, আসল দক্ষতা হলো—পণ্য কম দামে কেনো, বেশি দামে বেচো এবং মাঝখানে এতগুলো কারণ দাঁড় করাও যে, কেউ প্রশ্ন করলেও শেষ পর্যন্ত নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে সন্দেহে পড়ে যায়।

    অন্য দেশ হলে এসব ব্যবসায়ীর লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেত কি না জানি না, তবে আমাদের এখানকার ক্যানসারে আক্রান্ত সেন্সর বোর্ডের সেই সেন্স হবে, এমন ফিউচার টেন্স দেখা যাচ্ছে না। কারণ আমাদের বাজারে চোখ থাকা আর দেখা, কান থাকা আর শোনা, কর্তৃত্ব থাকা আর কর্তব্য—এই শব্দগুলো অনেক সময় একই বাক্যে ব্যবহার করা যায় না।

    আদার ব্যাপারীকে গলাকাটা দাম নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জাহাজ মার্কা বিড়ি ধরিয়ে আড়তদারকে দেখিয়ে দিয়ে বলেন, ‘উনারে জিগান।’ আড়তদারকে গিয়ে ধরলে তিনি বলেন, ‘ইমপোর্ট শর্ট আছে।’ ‘১৮৭ টাকায় আমদানি করা জিনিস কীভাবে ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়?’ এই প্রশ্নের উত্তর সোজা ভাষায় না দিয়ে কত ধরনের শারীরিক মোচড়ামুচড়ি করে দেওয়া হয়, সে এক দৃশ্য! প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে কারও ঘাড় কাত হয়, কারও চোখ কোটর থেকে অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে, কেউ বিড়িতে আগুন দেন, কেউ ফোন বের করেন, কেউ দূরের দিকে তাকান, যেন প্রশ্নের উত্তর সমুদ্রের ওপার থেকে আসবে। কেউ বলেন, ‘বুঝেন না, অনেক খরচ।’ এই ‘অনেক খরচ’ বাংলাদেশের বাজার অর্থনীতির সবচেয়ে রহস্যময় বাক্য। কোন খরচ? জিজ্ঞেস করলে খরচের তালিকা এমনভাবে বাড়তে থাকে যে, মনে হয় আদা নয়, মহাকাশযান আমদানি করা হয়েছে। পরিবহন, শ্রমিক, গুদাম, ভাড়া, নষ্ট, সুদ, ঝুঁকি, বৃষ্টি, রোদ, রাত, দিন, বাজারের পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে এমন এক ব্যয়বহুল ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয় যে, শেষে মনে হয় ১৮৭ টাকা আসলে ভুল; নিশ্চয়ই আদাটি চীন থেকে মানুষের মাথায় করে হেঁটে এসেছে।

    যেকোনো একটি আইটেম নিয়ে ১০-১২ দিন ছক্কা-পাঞ্জা করতে পারলে বড় বড় ডিলারের পক্ষে শতকোটি টাকা কামিয়ে নেওয়া যে কোনো ঘটনাই নয়, তা আন্দাজ করা যায়। বাজারে কৃত্রিম অভাবের শিল্প এতটাই উন্নত যে, এটিকে শিল্পকলার স্বীকৃতি দেওয়া যায় কি না, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। একজন শিল্পী রং দিয়ে ছবি আঁকেন, একজন কবি শব্দ দিয়ে কবিতা লেখেন, একজন সিন্ডিকেটকার দরদাম দিয়ে জনতার পকেট আঁকেন। প্রথম দিন একটু কম সরবরাহ, দ্বিতীয় দিন একটু গুজব, তৃতীয় দিন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, চতুর্থ দিন পরিবহন সমস্যা, পঞ্চম দিন বাজারে হাহাকার। ষষ্ঠ দিনে সাংবাদিক যান। সপ্তম দিনে মন্ত্রী বলেন নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অষ্টম দিনে আদার দাম আরও বাড়ে। নবম দিনে পাবলিক বলে, ‘কিছু হবে না।’ দশম দিনে কোনো নতুন পণ্যের দাম বাড়ে। একাদশ দিনে আদার খবর পুরোনো হয়ে যায়। দ্বাদশ দিনে বড় বড় হিসাবের খাতা বন্ধ হয়। অর্থাৎ পণ্যের দাম নিয়ে যে নাটক শুরু হয়েছিল, তার শেষ দৃশ্য সব সময় দর্শকের পকেটেই অভিনীত হয়।

    আদাকাণ্ডের মতো বড় বড় লঙ্কাকাণ্ডের পেছনে যাঁরা থাকেন, সেই ‘ভাশুর’দের নাম মুখে নিয়ে কে-ইবা পদে পদে বিপদ ডেকে আনতে চায়। আমাদের বাজারে কিছু নাম আছে, যা সবাই জানে কিন্তু কেউ জানে না; কিছু মানুষ আছে, যাঁদের অস্তিত্ব নিয়ে সবাই ফিসফিস করে, কিন্তু মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে সবাই বোবা হয়ে যায়। তাঁরা অর্থনীতির ডার্ক ম্যাটারের মতো—চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সবকিছুর ওপর তাঁদের প্রভাব অনুভূত হয়। বাজারে যে অদৃশ্য হাতের কথা অর্থনীতিবিদেরা বলেন, আমাদের এখানে সেই হাত মাঝেমধ্যে এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, সে শুধু বাজারকে পরিচালনা করে না, পাবলিকের পকেটও পরিচালনা করে। সেই হাত কার, তা জিজ্ঞেস করা যায় না। কারণ প্রশ্ন করতে করতে চাকরি যেতে পারে, ব্যবসা যেতে পারে, বিজ্ঞাপন যেতে পারে, সম্পর্ক যেতে পারে। ফলে নীরবতাই নিরাপদ। আমাদের দেশে বাক্স্বাধীনতার একটি বিশেষ অর্থনৈতিক সংস্করণ আছে—আপনি সব বলতে পারবেন, শুধু যার কথা বলা দরকার, তার কথা বলবেন না।

    আমদানি ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্য আন্ডার ইনভয়েসিং করা একটা ওপেন সিক্রেট কৌশল। যে মালের দাম ১ হাজার টাকা, সেই মালের দাম সরকারি খাতায় ১০০ টাকা দেখিয়ে একদিকে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া হয়, অপর দিকে সেই মাল এনে খুচরা বাজারে দেড় হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে বেচা হয়। মানে ব্যবসায়ীদের কেনায়ও লাভ, বেচায়ও লাভ। লাভের লাফে লাভালাভ। ক্ষতি শুধু বাংলাদেশের। রাষ্ট্র পায় কম ট্যাক্স, পাবলিক দেয় বেশি দাম, আর মাঝখানের মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফার মধ্যমণি হয়ে বসে থাকেন। অর্থনীতির ভাষায় এটাকে কী বলা হয় জানি না, কিন্তু গৃহস্থালির ভাষায় একে বলা যায়, এক গরুর দুধ দুই জায়গায় বিক্রি।

    সরকারের কাছে দাম কম, বাজারে দাম বেশি—দুই বিপরীত সত্য একই সঙ্গে ধারণ করার যে দার্শনিক ক্ষমতা, তা আমাদের ব্যবসায়িক সংস্কৃতির এক অসাধারণ অবদান। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, একটি জিনিস একই সময়ে একই অর্থে সত্য ও অসত্য হতে পারে না। তিনি বাংলাদেশি বাজারের আন্ডার ইনভয়েসিং দেখে গেলে হয়তো তাঁর বইয়ের কিছু অধ্যায় নতুন করে লিখতে হতো।

    একদিকে সরকারি হিসাবে কম দাম দেখিয়ে সরকারকে গরিব বানানো, অন্যদিকে খুচরা বাজারে বেশি দাম নিয়ে জনগণকে গরিব বানানো—দুই দিকেই একই ব্যবসার সাফল্য। এমন দ্বিমুখী দক্ষতা সাধারণ ব্যবসায়িক শিক্ষায় শেখানো হয় কি না জানা নেই। তবে বাস্তবের বিশ্ববিদ্যালয়ে এর বহু সফল গ্র্যাজুয়েট আছে। তাঁরা জানেন, নীতির কথা বলতে হয় সংবাদ সম্মেলনে, মুনাফার কথা ভাবতে হয় হিসাবের খাতায়। তাঁরা জানেন, দেশপ্রেম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবেগ, বিশেষ করে যখন দেশ থেকে টাকা নেওয়ার প্রয়োজন হয়; আর আন্তর্জাতিক বাজার একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অজুহাত, বিশেষ করে যখন দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয়। তাঁরা জানেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কথা বলতে হয় সেমিনারে, কিন্তু বাজারে প্রতিযোগী বেশি হলে মাথাব্যথা বাড়ে। তাই বাজারের স্বাধীনতা থাকে, শুধু বাজার স্বাধীন থাকে না।

    দাম বাড়া নিয়ে দু-চার দিন নিউজ-টিউজ হলে নজরদারি কর্তৃপক্ষ আদা-জল খেয়ে মাঠে নামার ছল করে। এই ‘আদা-জল খেয়ে নামা’ বাক্যটির মধ্যে এক ধরনের জাতীয় ট্র্যাজেডি আছে।

    আদা যে কিনতে গিয়ে জনগণের অবস্থা খারাপ, সেই আদার জল খেয়েই আবার আদার বিরুদ্ধে অভিযান! তবে অভিযান শুরু হলে সাধারণত প্রথমে বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা টের পান। কারণ ক্ষমতার হাত সাধারণত যেখানে পৌঁছাতে সহজ, সেখানেই আগে পৌঁছায়। বড়দের গুদামের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে গেলে নানা দরজা পেরোতে হয়। সেখানে অনুমতি আছে, পরিচয় আছে, প্রভাব আছে, প্রোটোকল আছে।

    ফলে ছোট দোকানদারকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে বড় সিন্ডিকেটকে একটি গভীর বার্তা দেওয়া হয়—আইন সবার জন্য সমান, তবে সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে পারে না।

    পরে অনেক জল ঘোলা করে ধীরে ধীরে ফিউজ হয়ে যায়। ফলে আদা-জল খেয়ে মূলত মল ছাড়া কোনো ফল মেলে না। আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ারও এক ধরনের ঋতুচক্র আছে। প্রথমে অস্বীকার, তারপর উদ্বেগ, তারপর তদন্ত, তারপর অভিযান, তারপর আশ্বাস, তারপর বিস্মৃতি। কোনো সমস্যা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন সেটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়। দ্রব্যমূল্যের অস্থিরতাও তেমন। আমরা আর একে সমস্যা বলি না; এটি আমাদের সামাজিক ক্যালেন্ডারের অংশ। শীত এলে শীত, বর্ষায় বৃষ্টি, রমজানে কিছু পণ্যের দাম, আর বছরের অন্য সময় অন্য কোনো পণ্যের বাজার—প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে বাজারের নিয়মের এখন এমন বন্ধুত্ব হয়েছে যে, একটি ছাড়া আরেকটি কল্পনা করা যায় না।

    একটা ব্যাপার এত দিনে পরিষ্কার হয়েছে। সেটা হলো, আমাদের বাজার হলো ভাগাড়। কাস্টমার হলো মরা গরু-গাধা। এখানে চিল, শিয়াল, শকুন, যার যেমন ইচ্ছা, খাবলা দিয়ে মাংস তুলে খাবে। যার জোর যত বেশি, সে তত পাবে। যার দাঁত বড়, সে বড় কামড় বসাবে। যার নখ ধারালো, সে গভীর খোঁচা দেবে। আর যার কোনো দাঁত-নখ নেই, সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলবে, ‘বাজারে অভিযান চলছে।’ বাজারের এই মহাভোজে পাবলিকের কাজ শুধু গায়ে চামড়া নিয়ে পড়ে থাকা। কারণ পকেট কাটা হয়েছে, পকেট ফাঁকা হয়েছে, তবু বাজারে যেতে হবে। মানুষ বেঁচে থাকলে খাবে, খেতে হলে কিনবে, কিনতে হলে বাজারে যাবে, বাজারে গেলে দামের দড়ি গলায় পড়বে। সভ্যতার এই চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। প্রাচীন দার্শনিকেরা মানুষের মুক্তি নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। কেউ বলেছেন আত্মজ্ঞান, কেউ বলেছেন নির্বাণ, কেউ বলেছেন ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র। বাংলাদেশের পাবলিকের মুক্তির প্রথম ধাপ সম্ভবত বাজারের তালিকা ছোট করা।

    একবার চাল, একবার ডাল, একবার মরিচ, একবার পেঁয়াজ, একবার আণ্ডা, একবার মুরগি, একবার নুন, একবার বেগুন, একবার তেল, একবার জেল—এই সব নিয়ে অনন্তকালীন পর্বের ধারাবাহিক অশ্রুসজল সামাজিক যাত্রাপালা চলতেই থাকবে। পাবলিক বেশি ইমোশনাল হয়ে পড়লে নাটকে মাঝেমধ্যে কিছু কমেডি দৃশ্য রাখা হবে। খরচের চাপে চ্যাপা শুঁটকি হয়ে যাওয়া দর্শক-শ্রোতাকে দু-একজন ভাঁড় এসে দু-চারটে চুটকি শুনিয়ে যাবেন। কখনো বলা হবে, বাজার নিয়ন্ত্রণে। কখনো বলা হবে, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। কখনো বলা হবে, শিগগিরই স্বস্তি ফিরবে। স্বস্তি আমাদের নাটকের সেই চরিত্র, যার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, কিন্তু যার প্রবেশ দৃশ্য বারবার পিছিয়ে যায়। দামের দাপট অবশ্য প্রধান নায়কের মতো প্রতিদিন নতুন পোশাকে হাজির হয়। আজ চালের চালে, কাল ডালের দুলুনিতে, পরশু পেঁয়াজের প্যাঁচে, আজকাল আদার আদিখ্যেতায়। নায়ক বদলায় না, শুধু মেকআপ বদলায়।

    এই বাজারনাটকের দর্শক হতে হতে পাবলিকের দর্শনও বদলে গেছে। আগে মানুষ বলত, জীবন অমূল্য। এখন বলে, জীবন অমূল্য হলেও বেঁচে থাকার উপকরণের দাম নির্ধারিত। আগে মানুষ ভাবত, ভাগ্য লিখে দেয় বিধাতা। এখন মনে হয়, মাসের শুরুতে বাজারদর লিখে দেয় কোনো অদৃশ্য সিন্ডিকেট। আমরা নিয়তি মানতাম, এখন নিয়ন্ত্রণহীন বাজার মানি। ধর্মে বলা হয়, রিজিকের মালিক আল্লাহ। বাজারে এসে অবশ্য মনে হয়, বিতরণের দায়িত্ব কিছু দালাল ও ডিলারের হাতে সাবকন্ট্রাক্ট দেওয়া হয়েছে। দর্শন এখানেই জটিল হয়ে ওঠে। পেটের ভেতর ক্ষুধা আর পকেটের ভেতর শূন্যতা যখন একসঙ্গে কথা বলে, তখন সক্রেটিসও হয়তো এক কেজি আদার দাম শুনে আত্মজ্ঞান ভুলে দরদাম করতেন।

    এখন চলছে পূর্ণদৈর্ঘ্য আদা-নাটক। নাটকের পরিচালনা ও প্রযোজনায় যাঁরা আছেন, তাঁদের ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’। কারণ এই নাটকের চরিত্ররা সামনে কম, পর্দার পেছনে বেশি অভিনয় করেন। তাঁরা স্ক্রিপ্ট লেখেন না, বাজারের দাম লেখেন। তাঁরা ডায়ালগ মুখস্থ করেন না, কেজিপ্রতি মুনাফার হিসাব মুখস্থ করেন। তাঁরা দর্শকের হাততালি চান না, চান পকেটের টাকা। তাঁদের নাটকে ভিলেন নেই, কারণ সবাই নিজেদের পরিস্থিতির শিকার; কিন্তু নায়কও নেই, কারণ পরিস্থিতি সামলানোর কেউ নেই। শুধু দর্শক আছে। দর্শকই টিকিট কেনে, দর্শকই কান্না করে, দর্শকই শেষে বাড়ি ফেরে। এই দর্শকের নাম পাবলিক।

    তাই আধপেট খেয়ে ভরপেটের ঢেকুর তোলা গাধা পাবলিক এই নাটকের চিত্রনাট্যে ধাঁধায় পড়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে না, ৫৮ টাকার আদা ২৮০ টাকা হয় কীভাবে, ১৮৭ টাকার আদা ৫০০ টাকা হয় কোন অঙ্কে, আর এতসব দেখেও দায়িত্বশীলদের চোখের সামনে কুয়াশা নামে কেন।

    পাবলিকের অবশ্য অঙ্কে কাঁচা হওয়ার ইতিহাস পুরোনো। সে শুধু জানে, নিজের পকেট থেকে কত টাকা বের হলো। এই অঙ্কটি খুবই নির্মম। এখানে আন্তর্জাতিক বাজার নেই, সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা নেই, মুদ্রানীতির মহিমা নেই। আছে শুধু হাতে কত টাকা ছিল এবং বাজার থেকে ফিরে কত টাকা থাকল। অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সত্য হয়তো এটিই—যে অঙ্ক সবচেয়ে বেশি মানুষ বোঝে, সেই অঙ্কটিই সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়।

    শেষ পর্যন্ত আদার ব্যাপারী আর জাহাজের খবর এখন আর আলাদা বিষয় নয়। জাহাজ ভিড়ুক বা না ভিড়ুক, পাবলিকের পকেট ভেড়ার জায়গা নেই। একসময় আদা-রসুন নিয়ে রান্না হতো। এখন আদার দাম শুনে রসুনেরও বোধ হয় গা ঘামছে। আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন বাজারে গিয়ে মানুষ পণ্যের দাম শোনে, বাড়ি ফিরে নিজের জীবনের মূল্য নিয়ে চিন্তা করে। এই চিন্তা অবশ্য দার্শনিকদের চিন্তা নয়। দার্শনিকেরা চিন্তা করেন মানুষ কেন বাঁচে; পাবলিক চিন্তা করে, বাঁচতে হলে কাল কী রান্না হবে।

    এই হচ্ছে আমাদের বাজারদর্শন। এখানে সবকিছুই অনিত্য—সরবরাহ, সরকারি আশ্বাস, অভিযান, তদন্ত, প্রতিশ্রুতি, সংবাদ। শুধু দাম আর দুঃখের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী সম্পর্ক আছে। হেরাক্লিটাস বলেছিলেন, একই নদীতে দুবার নামা যায় না। বাংলাদেশের বাজারে অবশ্য একই দামের নদীতেও দুবার নামা যায় না। সকালে যে আদা ২৮০ টাকা, বিকেলে সে ৩২০; বিকেলে ৩২০, পরদিন ৩৮০। পরিবর্তনই চিরন্তন—এ কথা দর্শনের বইয়ে লেখা ছিল। আমাদের বাজারে পরিবর্তনও একমুখী। নিচ থেকে ওপরে। মূল্যবোধ নিচে নামে কি না জানি না, মূল্য সব সময় ওপরে ওঠে।

    তাই আদার এই আপাত তুচ্ছ ব্যাপারটি আসলে শুধু আদার ব্যাপার নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, বাজার, সমাজ ও নাগরিকত্বের এক ক্ষুদ্র কিন্তু কেজিপ্রতি পাঁচ শ টাকার দর্শন। আদা মাটির নিচে জন্মায়, কিন্তু আমাদের দেশে তার দাম আকাশে ওঠে। মাঝখানে যে বাজার আছে, সেই বাজারই বুঝি সভ্যতার আসল ভূগোল। সেখানে মাটির নিচে উৎপাদক, মাটির ওপরে পাবলিক, আর আকাশে দামের দেবতা। আমরা নিচে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকি। কেউ বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কেউ বলেন, অভিযান চলছে। কেউ বলেন, জাহাজ আসছে। কেউ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার। আর আদা নীরবে ঝুড়িতে পড়ে থাকে। হয়তো সে-ও ভাবছে, ‘আমার ব্যাপার নিয়ে এত ব্যাপার কেন?’ আমরা জানি না। কারণ আদার কোনো মুখ নেই। মুখ থাকলে হয়তো সে-ও আমাদের বাজারের মতোই বলত, ‘উনারে জিগান।’

    তারপর আমরা আবার বাজারে যাব। চাল কিনব, ডাল কিনব, তেল কিনব, মরিচ কিনব, হয়তো এক টুকরা আদা কিনে চায়ের কাপে দেব। দাম দেব, ব্যাগ নেব, দীর্ঘশ্বাস ফেলব। বাড়ি ফিরে খবর দেখব—বাজারে অভিযান হয়েছে। পরদিন আবার বাজারে গিয়ে দেখব, আদার দাম বেড়েছে। তখন আমাদের মনে হবে, পৃথিবী ঘোরে কি না জানি না, কিন্তু বাজার অবশ্যই ঘোরে। এই ঘূর্ণনের কেন্দ্র কোথায়, কে জানে! বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর কেন্দ্র নিয়ে গবেষণা করেছেন, দার্শনিকেরা মানুষের কেন্দ্র খুঁজেছেন, অর্থনীতিবিদেরা বাজারের কেন্দ্র খুঁজেছেন। আমরা সাধারণ মানুষ এত গবেষণার দরকার দেখি না। আমরা জানি, আমাদের বাজারের কেন্দ্র একটাই—আমাদের পকেট। আর সেই পকেটের চারপাশে চিল, শিয়াল, শকুন, সিন্ডিকেট, সাপ্লাই চেইন, আড়ত, আমদানি, অভিযান, আশ্বাস—সবাই মিলে এমনভাবে প্রদক্ষিণ করছে যে, পাবলিকের মাথা ঘুরলেও বাজারের মাথা ঘোরে না।

    এটাই বোধ হয় মুক্তবাজারের মুক্তির দর্শন। এখানে বাজার মুক্ত, মুনাফা মুক্ত, দাদাগিরি মুক্ত, দায়মুক্তি মুক্ত; শুধু পাবলিক মুক্ত নয়। পাবলিক বাজারে যাওয়ার জন্য স্বাধীন, কিন্তু না কেনার জন্য স্বাধীন নয়। আদা খাবে কি না, সে সিদ্ধান্ত তার; কিন্তু আদার দাম কত হবে, সে সিদ্ধান্ত তার নয়। আমরা ভোট দিতে পারি, মত দিতে পারি, মন্তব্য করতে পারি, কিন্তু বাজারের দরদাম নির্ধারণের গণতন্ত্রে আমাদের ভোট নেই। ফলে নাগরিক হিসেবে আমরা সার্বভৌম, ক্রেতা হিসেবে সার্বভৌমত্বহীন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বইয়ে এই নতুন শাসনব্যবস্থার নাম কী জানি না। বাজারে অবশ্য নাম জানার দরকার নেই। দাম জানলেই যথেষ্ট। আর সেই দাম শুনে যদি কারও মাথা ঘুরে পড়ে যায়, তাহলেও বাজারের কোনো ক্ষতি নেই। কারণ মাথা ঘোরা পাবলিকের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আদার ব্যাপার একেবারেই আলাদা।

    সম্পর্কিত প্রতিবেদন

    Comments